Press "Enter" to skip to content

বাঙালির বিশেষ প্রিয় জিভে জল আনা শীতকালীন পিঠেপুলি….।

Spread the love

“পিঠাপুলি বা পিঠেপুলি ”
————————————-

ডাঃ দীপালোক বন্দ্যোপাধ্যায় : ৭ ডিসেম্বর, ২০২৩। বাঙালির বিশেষ প্রিয় জিভে জল আনা শীতকালীন খাবার ৷ কোন পিঠার ভিতরে থাকে পুর দেওয়া আবার কোনটার মধ্যে পুর থাকে না ৷ দুরকম মিলে বলি পিঠা পুলি ৷ পিঠা কথাটি এসেছে সংস্কৃত “পিষ্ঠক” থেকে ৷ ‘পিষ্ ‘ ক্রিয়ামূলে তৈরী শব্দ ‘পিষ্ট’ থেকে ৷আর “পুলি” শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ‘পোলিকা’ থেকে ৷ হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বঙ্গীয় শব্দকোষ বলছে পুলি হল নারকেলের পুর দেওয়া খাবার ৷জাতি হিসাবে বাঙালির স্বীকৃতি আসার সময় থেকে বঙ্গদেশে এর প্রচলন ৷ কৃত্তিবাসী রামায়ণ , মনসামঙ্গল , ধর্মমঙ্গল , অন্নদামঙ্গল , চৈতন্যচরিতামৃত , ময়মনসিংহ গীতিকা সবেতেই রয়েছে পিঠে তৈরী ও খাওয়ার কথা ৷বিভিন্ন পরিবারে ও এলাকায় রয়েছে স্বাদে , উপকরণে ও প্রাচীনত্বে ভিন্নতা ৷কনকনে শীতে ওঠে খেজুর গুড় ৷শীতকালে পিঠে প্রস্তুতির জন্য বাংলা ও অসমের গ্রামগঞ্জের মেয়েরা চাল ভিজিয়ে ঢেঁকিতে কুটতে লেগে পরতেন ৷ তখন না ছিল মিক্সি না মেশিন ৷ তবে , ঢেঁকিতে কোটা চালের পিঠার স্বাদ এখন এসবে পাই না ৷ তাই , প্রত্যন্ত গ্রামের পরিশ্রমী মহিলারা আজও এই সময় নতুন করে ঢেঁকি পাতেন ৷ আর শহুরে মহিলারা কেনা চাল গুঁড়োয় কেউ কেউ বাড়ীতে দু তিনরকম পিঠে বানালেও মেলায় গিয়ে পিঠা কিনে খায় ৷ তাঁদের পেটে পিঠে সয় ৷ কিন্তু , জায়গা ও সময়ের অভাব ৷ এখন প্রায় শহরেই তাই হচ্ছে পিঠেপুলির মেলা ৷

বই মেলা থেকে শিল্প বা ভ্রমণ মেলা সবেতেই বসে বাঙালি খাদ্যরসিকদের জন্য পিঠাপুলির স্টল ৷ গ্রামে পৌষ সংক্রান্তিতে এখনও ঘরে ঘরে চালের গুঁড়ো ,রাঙা আলু ,সন্দেশ , খেজুর গুড় , আখের গুড়, তিল , আদা , ক্ষীর , সন্দেশ , নারকেল ইত্যাদি দিয়ে পিঠে হয় ৷ এই সময় খেজুরের নলেন গুড় ওঠে বলে পিঠে বেশি হয় ৷ অনেক বাড়ীতে ভাত -রুটি-মুড়ির বদলে পেট পুরে তা খাওয়া হয় ৷ পৌষ সংক্রান্তিতে নতুন ফসলের উৎসব হয় “পৌষ পার্বণ “৷ এদিনে চিতই পিঠা বানানোর মাটির সড়া বা পাত্রর খোলা পোড়ানো হয় বলে হিন্দুরা অনেকে এর আগে পিঠে খান না ৷জানুয়ারির মাঝামাঝির এই দিনে বা মকর সংক্রান্তি তিথিতে সূর্য মকর রাশিতে প্রবেশ করে ৷ সংক্রান্তি মানে সূর্যের এক রাশি থেকে অন্য রাশিতে প্রবেশ করা ৷ ক্ষেতের ফসল গোলাজাত করার আনন্দে রাঢ় বাংলায় বাড়ীর গিন্নিরা ধানের মড়াইয়ে খড় বেঁধে প্রতীকি ভাবে লক্ষ্মীকে ধরে রাখেন ৷ অনেক বাড়ীতে লক্ষ্মী পুজো হয় ৷ ছেলেরা বলে ,’ আওনি , বাওনি , চাওনি , ৷ আমি তো পিঠে খাই নি !” পিঠে তৈরীর ঐদিনটি হল “চাঁউড়ি” ৷

তারপর খড় বেঁধে হয় “বাঁউড়ি “৷ পুর্ববঙ্গে পিঠা খেতে জামাইকে শ্বশুর বাড়ী নিমন্ত্রণ করা হয় ৷ আবার আত্মীয় কুটুম্বের বাড়ী পিঠাপুলি পৌঁছে দেওয়া হয় ৷অনেক হিন্দু বাড়ীর সামনে আল্পনা দেওয়া হয় ৷
পিঠে খেতে ঘুরেছি দুই বাংলা ও অসমের নানা জায়গায় ৷ খাদ্যরসিক আমি এর বিকল্প বেশি কিছু পাই নি ৷ খেয়েছি ভাজা পিঠা , ভাপা পুলি , মিষ্টিবা ঝাল বা বাঁশ ভাপা পিঠা , নকশি পিঠা ( ঝাল এবং মিষ্টি ) , চুটকি পিঠা , ধুপি বা ধুকি পিঠা , খোলাজালি পিঠা , জামদানি পিঠা , জিলাপি পিঠা , কড়িপিঠা , পাতা পিঠা , সুন্দরী পাকন , কলা পিঠা ,মুঠি পিঠা , ঝুরি পিঠা ,সেমাই কুলি পিঠা , শামুক পিঠা , ঝিনুক পিঠা , খেজুর পিঠা , গোলাপ ফুল পিঠা , লবঙ্গ পিঠা , পাকড়া পিঠা , মালাই পিঠা ,চিতই , আন্দোসা , ডিমের ঝাল পিঠা , ভর্তা চিতা , সাগুর পিঠা , দই পিঠা , ছিটরুটি পিঠা , ভাপ কলাই , আসকে , গোকুল , তেলের পিঠে , চন্দ্রপুলি , মোহনপুলি , দুধ পিঠা , রস পিঠা , গুড় পিঠা , সিদ্ধ পিঠা , সাদা পিঠা , পাটি সাপটা , বিক্রমপুরী বিবিখানা পিঠা থেকে বাঁশের টিউবের ভিতরে তৈরী অসমিয়া বা সিলেটি সুঙ্গা পিঠা ৷ বেশির ভাগ পিঠা মিষ্টি জাতীয় হলেও সরিষা বাটা , লঙ্কা বা মরিচ এমনকি শুটকি দিয়ে ঝাল পিঠাও হয় ৷


ছেলেমেয়েদের কেক , পিৎজা ,প্যাটিস না খাইয়ে মুখে তুলে দিন বাঙালির ঐতিহ্যবাহী পিঠেপুলি ৷ কয়েকবার
খেলেই তারাও আমাদের মত পিঠের ভক্ত হয়ে যাবে ৷
জলখাবার বা নাস্তায় কিংবা ডের্জাট হিসাবে দিতে পারেন ৷ রসনা তৃপ্ত হলে বাঙালির পিঠা শিল্প দিকে দিকে ছড়িয়ে যাবে ৷ অনেকের কর্মসংস্থান হবে ৷

More from CultureMore posts in Culture »
More from FoodMore posts in Food »
More from InternationalMore posts in International »

Be First to Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *