Press "Enter" to skip to content

দশহরা ও গঙ্গাপূজা….।

Spread the love

ডাঃ দীপালোক বন্দ্যোপাধ্যায় : কলকাতা, ৮ জুন ২০২৪।
————————————————————–
গঙ্গা – ” গো” – পৃথিবী , দ্বিতীয়ার একবচনে “গাম্ ”
গাং(পৃথিবীকে) + গম+৬( কতৃবাচ্যে) + স্ত্রীলিঙ্গে আপ প্রত্যয় করে “গঙ্গা “! আমাদের কাছে গঙ্গা শুধু নদী নয় , দেবীও ৷ স্বর্গ , মর্ত্য ও পাতাল তিন লোকে প্রবাহিত তাই ” ত্রিলোকপথগামিনী”৷ বিষ্ণুর পাদপদ্ম থেকে উৎপন্ন গঙ্গা ব্রহ্মার কমন্ডলু হয়ে শিবের জটার মাধ্যমে পতিত উদ্ধার
করতে মর্ত্যে এসেছেন ৷ তাই , আমরা বলি ,” ওঁ গঙ্গায়ৈ শিবায়ৈ নারায়ন্যৈ নমো নমঃ “৷ভগীরথের তপস্যায় তুষ্ট হয়ে ব্রহ্মা গঙ্গাকে বলেন মর্ত্য হয়ে পাতালে যাও মানুষকে মুক্তি দাও ৷ সরাসরি গঙ্গার জলধারা পৃথিবীতে পড়লে জগৎ ধ্বংস হয়ে যেত ৷ তখন ভগীরথ শিবের শরণাপন্ন হন ৷ শিব মর্ত্যে নামার আগে গঙ্গাকে নিজের চুল দিয়ে বানানো জটায় আটকে গঙ্গাকে অল্প অল্প করে পৃথিবীতে ছাড়েন ৷ বৈষ্ণব মতে ব্রহ্মা তাঁর কমন্ডুলুর জল নিয়ে বিষ্ণুর পা ধোয়ার সময় গঙ্গার জন্ম ৷ আবার অন্য মতে , গঙ্গা পর্বতরাজ হিমালয় ও মেনকার মেয়ে ৷ সেই অর্থে পাবর্তীর বোন ৷” গঙ্গার বাহণ হল “মকর” ( যার দেহাংশ কুমীর ও লেজটি মাছের মত / অনেকটা পশ্চিমী জ্যোতিষের ক্যাপ্রিকন ) ৷ আরেক হিন্দু দেবতা বরুণেরও বাহণ মকর ৷ঋকবেদ , রামায়ণ , হরিবংশ, মহাভারত , ভাগবত , শিব ও ব্রহ্মবৈর্বতপুরাণে তাঁর কথা লেখা আছে ৷ গঙ্গা কলিযুগে পরম তীর্থ ৷ ঋষি পুলস্ত্য তাই ভীষ্মকে বলেছেন ,’ যেখানে গঙ্গা আছেন সেই দেশই সিদ্ধ তীর্থ ‘ ৷ আমরা সৌভাগ্যবান গঙ্গা তীরের গ্রামে আজন্ম রয়েছি ৷ গ্রামের গঙ্গার ঘাটে তোলা এই ছবি ৷ঋক্ বেদে ( ১০/৭৫/০৫) গঙ্গার কথা আছে ৷ ২৫২৫ কিমি দৈর্ঘ্যের ১০৮০০০০ কিমি অববাহিকার এই নদী ভারতবর্ষের প্রাণস্বরূপা ৷হিমালয় থেকে আকরিক ও হিউমাস মাটি বহন করে তৈরী করেছে বিশাল দোয়াব অঞ্চল ৷ ভারতের এক -চতুর্থাংশ মানুষের জীবন ও জীবিকা গঙ্গা ও তার শাখা নদী গুলির উপর নির্ভর করে ৷অন্ততঃ চল্লিশ কোটি মানুষ এই নদীর দ্বারা উপকৃত ৷ কিছুকাল আগেও ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে বিশুদ্ধ নদী ৷ যে নদীর মধ্যে জৈব বর্জ্য পর্দাথকে ভেঙ্গে নিজেকে শুদ্ধ রাখার ক্ষমতা রয়েছে ৷

যা একপ্রকার অণুজীবের (ব্যাকটিরিয়ফাজ) জন্য সম্ভব হয়েছে বলে বিজ্ঞানীদের ধারনা৷ কিন্তু , পবিত্র এই নদীকে আমরা দূষিত করে চলেছি ৷ কলকারখানার বর্জ্য , নাগরিক বর্জ্য দিয়ে ৷ গঙ্গা হয়েছে ক্ষতিকর কলিফর্ম ব্যাকটিরিয়া আবাস স্থল ৷ এতে মানুষ , প্রকৃতি , পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে ৷ ১৪০ প্রজাতির মাছ , ৯০ প্রজাতির উভচর প্রাণী সহ গাঙ্গেয় শুশুক বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে ৷ অথচ গঙ্গা একশন প্ল্যান ঠিক ভারে কার্যকর হচ্ছে না ৷ পবিত্র ভেবে ছেড়ে দেওয়া মানুষ ও পশুর মৃতদেহ ৷ গঙ্গা দূষণ মুক্তির দাবীতে ২০১৮ সালে ১১২ দিন অনশনের পর পরিবেশ বিদ গুরুদাস আগরওয়াল জীবন বলি দেন ৷ এ পর্যন্ত দশ জন সন্ন্যাসী গঙ্গার কলুষতা রোধের দাবীতে অনশন করে প্রাণ দিয়েছেন ৷( আমার লেখা “সনাতনী কৃষ্টিকথা ” বইতে হিন্দু ধর্মাবল্বীদের এরকম অনেক বিষয়ে আলোকপাত করার চেষ্টা করেছি ৷)
” দশহরা ” -জ্যৈষ্ঠ মাসের শুক্লপক্ষের দশমী তিথিতে হস্তা নক্ষত্রে গঙ্গা পৃথিবীতে অবতরণ করেছিলেন ৷একে গঙ্গা দশহরা বা গঙ্গা দশমী বা গঙ্গা জয়ন্তী বলে ৷এবারে ১ আষাঢ় ১৪৩১( ১৬ জুন ২০২৪ রবিবার ) শুক্ল পক্ষের দশমী তিথিতে পড়ছে “গঙ্গা দশহরা ৷ ঐ দিন ভারতীয় সময় দুপুর ২টো ৩২ মিনিট থেকে ঐ তিথি শুরু হয়ে দশহরা তিথি শেষ হবে ১৭ জুন বিকাল ৪টে ৪৩ মিনিটে ৷১৬ জুন সনাতনীদের কাছে স্নান দানের পূণ্য মুহূর্ত ৷১৬ জুন ভোর ৪.০৩ থেকে ৪.৪৫ মিনিট পর্যন্ত থাকবে সে সময় ৷ এবারে বেলা ১০.২৩ মিনিট থেকে পড়ছে সর্বার্থ সিদ্ধি যোগ , অমৃত যোগ ও রবি যোগ ৷দশবিধ ফল দিয়ে গঙ্গা পূজার বিধি ৷ হিন্দু বিশ্বাস গঙ্গা দশহরা তিথিতে গঙ্গা স্নান করলে ১০- পাপ স্খলন হয় ৷ এরমধ্যে ৩ টি বাচিক পাপ , ৩ টি শারীরিক পাপ এবং ৪টি মানসিক পাপ ৷ দেবী কর্মফল হরণ করে মুক্তি বা মহাফল প্রদান করেন ৷বৈদিক যুগে দশহরা থেকে নববর্ষ শুরু হত ৷ এদিনের প্রধান ধর্মীয় কাজ “গঙ্গা স্নান ” ৷বাড়ীতে স্নানের জলে কয়েক ফোঁটা গঙ্গার জল মিশিয়ে গঙ্গাস্তোত্র পাঠ করে স্নান করলেও একই ফললাভ হয় ৷বলতে হয় – “রোগং শোকং তাপং পাপং হর মে ভগবতী কুমতিকলাপাম্ ৷ ত্রিভুবনসারে বসুধাহারে ত্বমসি গতির্মম খলু সংসারে ৷”আসলে তিনি যে “সদ্যঃ পাতকসংহন্ত্রী সদ্যোদুঃখবিনাশিনী ৷

সুখদা মোক্ষদা গঙ্গা গঙ্গৈব পরমা গতিঃ” ৷ অর্থাৎ যিনি সাথে সাথে পাপ হরণ করেন , দুঃখ দূর করেন , সেই সুখদাত্রী মোক্ষদাত্রী গঙ্গাই আমার পরম গতি ৷
এই দিন গঙ্গাস্নানে দশ জন্মের সব পাপ দূর হয় ৷
অযুত অশ্বমেধ যজ্ঞের ফল পাওয়া যায় ৷ পুরা কালে অশ্বমেধ যজ্ঞের ঘোড়া আটকে থাকা নিয়ে সগর রাজার পুত্ররা কপিল মুনিকে গালিগালাজ করার ফলে তাদের কপিল মুনির কোপে ভস্ম হতে হয় ৷তাদের আত্মার মুক্তির জন্য সগর , অসমঞ্জ , দিলীপ অসর্মথ হয় ৷ইক্ষাক্ষু বংশের সগর রাজার পুত্রদের আত্মার সদ্গতির জন্য তাদেরই পরপুরুষ দিলীপের ছেলে ( যিনি রামচন্দ্রের পূর্বপুরুষ) ” ভগীরথ” এই দিনে গঙ্গাকে মর্ত্যে এনেছিলেন ৷ তাই গঙ্গার অন্যনাম ” ভাগীরথী “৷

ভগীরথের পূর্বপুরুষরা “দশহরায় ” গঙ্গা আসায় মোক্ষ লাভ কলেন বা মুক্তি পান ৷স্কন্দ পুরাণ মতে এদিন দশটি ফল , ফুল ও প্রদীপ দিয়ে এদিনে মা গঙ্গার আরাধনা করলে দশ জন্মের এবং দশবিধ পাপ ক্ষয় হয় বলে এই দিনটি ” দশহরা ” ৷ আমরা প্রায় প্রত্যেকেই কায়িক ( হিংসা করা , মারধোর করা , চুরি করা ও পর দ্রব্যে লোভ করা এবং পরদার গমনের মত ), বাচিক ( অহংকার পূর্ণ বাক্য , আজে বাজে কথা , পরনিন্দা , পরচর্চা )এবং মানসিক ( মনে মনে কারো ক্ষতির চিন্তা , অন্যের জিনিসে আসক্তি বা অভিলাষ ) নানা পাপ কাজ করি ৷ ৷সাক্ষাৎ দেবী গঙ্গা সুরলোকের ঈশ্বরী , ত্রিভূবনতারিণী ,পতিত
উদ্ধারিণী গঙ্গায় অবগাহন এমনকি গঙ্গা নাম স্মরণেও সব পাপ দূর হয় ! ” সর্বং কুতযুগে পুণ্যংত্রেতায়াং , পুষ্করাং স্মৃতম্ ৷ / দ্বাপরে তু কুরুক্ষেত্রং ,/ গঙ্গা কলিযুগে স্মৃতা “! হিমালয়ের গোমুখ শৃঙ্গ থেকে ভূগোল অনুসারে গঙ্গার উৎপত্তি ৷যেখানে অলকানন্দার সঙ্গে গঙ্গা মিলেছে তা “দেবপ্রয়াগ” ৷ হরিদ্বারে এই জায়গায় গঙ্গা মাঈয়া হিমালয় থেকে সমতলে নেমেছেন ৷ এরপর প্রয়াগ ( এলাহাবাদে) ক্ষেত্রে তিনি যমুনা ও সরস্বতীর সঙ্গে মিলিত হয়েছেন ৷ বারাণসী হয়ে গঙ্গাসাগরে সাগরের সাথে মিলে গেছেন ৷ রবিবারে দশহরা দিনটি কোন দামী জিনিস কেনা , গৃহপ্রবেশ প্রভৃতি কাজের জন্য শুভ ৷এইসময় অনেক মন্দিরের দরজা বন্ধ রাখা হয় ৷ এদিন মেঘ ডাকলে ( প্রতিবারই এই সময় বৃষ্টি হয় ) সাপের নাকি ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয় ৷তাই এই দিন মনসারও পূজা হয় ৷এদিন বটুক ভৈরবেরও আবির্ভাব তিথি ৷ অনেক বাড়ীতে এদিন হয় অরন্ধন ৷ “দশহরার” পুণ্যদিনে সব নদী / জলাশয় গঙ্গার সমতুল্য হয় ৷ গঙ্গা বা জলাশয়ে ডুব দেওয়ার সময় “ওঁ নমঃ শিবায় নারায়ণায় দশেরায় গঙ্গায় নমঃ ” মন্ত্র বলে স্নান করতে হয় ৷ স্নানে পাপনাশ হয় ৷
” দশহরা মাগো তুমি পুণ্যতীর্থ পুণ্যতোয়া ” ৷জয় মা গঙ্গা ! তোমাকে প্রণাম ! সবাইকে দশহরা বা গঙ্গা পূজার শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাই ৷

More from CultureMore posts in Culture »
More from SocialMore posts in Social »

Be First to Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *