Press "Enter" to skip to content

কলেজ স্ট্রিট, বইপাড়া, বর্ণপরিচয়, আমফান ও তেতো কথা!………

Spread the love

রণবীর ভট্টাচার্য: কলকাতা, ৪ জুন, ২০২০। ঠিক দুই সপ্তাহ আগে অবধি, বাঙালির বার্ষিক স্বস্তির অন্যতম একটি দিক ছিল, আর যাই হোক, সাইক্লোন বঙ্গে কোন ক্ষতি করবে না। ফেয়ারনেস ক্রিম মাখা বাঙালি বরাবর ‘উড়ে’-দের উপর ভরসা করে এসেছে যে প্রতিবারের মত ওডিশা এবারও সাইক্লোন নিজেদের দিকে টেনে নেবে আর নিদেনপক্ষে সুন্দরবন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কিন্তু সব সময় সব হিসেব তো আর মেলে না। তাই জোব চার্নকের শহরকে প্রায় এক সপ্তাহ অন্ধকারে রাস্তা থেকে জল আনতে হয়েছে আর দোষারোপের পিং পং বল শুধু এই হাত থেকে ওই হাত হয়েছে। এই সব কিছুর মধ্যে চরম ক্ষতি হয়েছে বাঙালির অহংকার কলেজ স্ট্রিটের বইপাড়ার। আমফান বলুন বা উমফুন, সাইক্লোন পরবর্তী ঝড়, বৃষ্টি ও এক হাঁটু জলে ছোট বড় সব দোকানের বেশিরভাগ বই ভিজে গিয়েছে। তাই সাইক্লোনের পরের কয়েক দিন যারাই গিয়েছেন বইপাড়ায়, দেখেছেন ছোট বড় বই ব্যবসায়ীদের হাহাকার, তারা ভবিষ্যতের কথা ভেবে বই শুকোতে দিচ্ছেন। কিন্তু এরকম কি সত্যিই হওয়ার ছিল? ফিরে যাওয়া যাক প্রায় বছর পনেরো আগে, যখন কলকাতা স্বপ্ন দেখেছিল এশিয়ার সবচেয়ে বড় বইয়ের মল তৈরি হবে এই শহরেই। সেখানে ছয় তলা গাড়ি রাখার জায়গা থাকবে যাতে অন্তত ৬০০টি গাড়ি থাকতে পারে একসাথে।

নাম দেওয়া হয়েছিল ‘ বর্ণপরিচয়’ – অনেকটা চিনের পেকিং শহরের ৫ লক্ষ স্কোয়ার ফিটের সিতান বইয়ের মলের মত। বলা হয়েছিল দোতলা থেকে সাত তলা বইয়ের দোকান থাকবে, এছাড়া সাংস্কৃতিক চর্চার জন্যে মুক্তাঙ্গন থাকবে। কিন্তু দেড় দশক জুড়ে কলেজ স্ট্রিট শুধু মন খারাপ করেছে, নতুন প্রেসিডেন্সি দেখেছে, কফি হাউসে গিয়ে অতীত খুঁজেছে আর নতুন ডিএসএলআর নিয়ে ছবি তুলেছে। কিন্তু বই বিক্রেতার কথা ভেবেছে কি? বর্ণপরিচয় যা হওয়ার ছিল, তার অনেক আগেই থমকে গিয়েছে! ল্যাপটপ, গেঞ্জি, এসি বা বিরিয়ানি বিক্রি করার সাথে বিস্তর ফারাক রয়েছে বই বিক্রির। যেখানে অক্ষরজ্ঞান মানদন্ড নয়, নিজের অন্তর আত্মাকে খুশি করার তাগিদ রয়েছে, সেখানে বই বেঁচে সংসার চালানো কঠিনতম কাজের মধ্যে একটা। কলেজ স্ট্রিট বোধহয় পৃথিবীর এমন একটা জায়গা, যেখানে আর সব কিছু থাকা সত্ত্বেও মানুষ স্রেফ বইয়ের খোঁজে আসে। বলাই বাহুল্য, শেষ এক দশক জুড়ে কলেজ স্ট্রিট অনেক বেশি মুখ চিনেছে চাকরির পরীক্ষার বই কিংবা ডাক্তারি – ইঞ্জিনিয়ারিং এর দরজার, তবুও নিজের পরিচয় হারায়নি। অনেকেই বইমেলার উদাহরণ দেবেন, কিন্তু সব ছোট পাবলিশার বা দোকানদাররা কি সুযোগ পান সেখানে? এমনিতেই লড়াই হয়ে উঠেছে কঠিন, অনেকেই শক্তিশালী মলাটের বই ছেড়ে স্রেফ পিডিএফ নিয়ে ভাবছেন যাতে মোবাইলে জায়গা পেয়ে যায় নতুন সাহিত্য। ফেসবুকের মতো সোশ্যাল মিডিয়ার অধুনা জনপ্রিয় অডিও স্টোরি নতুন চিন্তা উদ্রেক করছে।

তার সাথে সাথে ক্রসওয়ার্ড, স্টোরির মত আধুনিক কলেবর আনা দোকান তো আছেই, যেখানে বই থেকে পেন ড্রাইভ সব সাজানো রয়েছে! আশার কথা, দেশ বিদেশ থেকে প্রচুর মানুষ এগিয়ে আসছেন সাহায্য নিয়ে। অনেকেরই কোন স্বার্থ নেই, প্রবাসী বাঙালিরা আছেন, প্রেসিডেন্সি – যাদবপুরের প্রাক্তনীরাও আছেন। কিন্তু বছর কুড়ি পর কলেজ স্ট্রিটের বইপাড়া থাকবে তো? না স্রেফ হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য হয়ে নিভু নিভু হয়ে জ্বলবে?

More from GeneralMore posts in General »

Be First to Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *