Press "Enter" to skip to content

করোনা প্রতিষেধক ‘গোমূত্র’ কুসংস্কার নয়, শাস্ত্রে উল্লেখ আছে……

Spread the love

—বিজ্ঞানে নয়, বি জে পি বিশ্বাসী কাউপ্যাথিতে—
সুজিৎ চট্টোপাধ্যায়: কলকাতা, করোনা আতঙ্ক বাড়ছে রাজ্যে। ইতিমধ্যে একজন রাজ্য সরকারের আমলার পুত্র বিদেশ থেকে ফিরে নিজের অসুস্থতা লুকিয়ে বাড়ি ফিরে যায়। প্রশাসনের তরফে বাড়ি থেকে না বেরোতে বলা হয়। কিন্তু তিনি সেই নির্দেশ অগ্রাহ্য করে শহরে ঘুরে বেড়ান। তাঁর মা নবান্নে অফিস করেন। ফলে শিক্ষিত মা এবং শিক্ষিত পুত্রের উদাসীনতার কারণে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা বেড়ে গেলো।
অন্যদিকে বি জে পি বিপদে মানুষের পাশে থাকার অঙ্গীকার নিয়ে রাজ্যে অনেক জায়গায় গোমূত্র পান করানোর কর্মসূচি নিয়েছে। কলকাতায় বি জে পি নেতা নারায়ণ চট্টোপাধ্যায় খাটালে গো পূজা করে বোতল বন্দী করেন গোমূত্র। তারপর শুধু সমর্থকদের নয়, পিন্টু প্রামাণিক নামে এক হোমগার্ডকে গোমূত্র পান করান। পরের দিন সেই হোম গার্ড জোড়াবাগান থানায় নারায়নবাবুর বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করে বলেন, তাকে ভুল বুঝিয়ে গোমূত্র পান করানো হয়েছে। ফলে এই অভিযোগের ভিত্তিতে জোড়া বাগান থানা অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধির ২৬৯(মানুষের মধ্যে বিপদজনক রোগ ছড়ানোর প্রচেষ্টা), ২৭৮ (বায়ু দূষণ ঘটিয়ে স্বাস্থের জন্য বিপদজনক করে তোলা) ৩৩২ (সরকারি কর্মীকে কাজে বাধাদান) ১১৪ (অপরাধে উৎসাহ দান)ধারায় মামলা রুজু হয়েছে।

অভিযুক্তকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। এই প্রেক্ষিতে রাজ্য বিজেপি সভাপতি দিলীপ ঘোষ নিজের প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছেন,তিনি নিজে গোমূত্র খান।ভারতের সংস্কৃতিতে গোমূত্র পানের নির্দেশ আছে।তাই হিন্দু শাস্ত্রে বিশ্বাস রেখে গোমূত্র পান করা বা কাউকে পান করানো কোনো দোষ নয়।
বিজেপি রায়গঞ্জ উত্তর শহর মন্ডল সভাপতি অভিজিৎ যোশীও স্থানীয় মানুষকে শাস্ত্রীয় রীতি মেনে গোমূত্র পান করান। ডানকুনিতে
জনৈক দুগ্ধ ব্যবসায়ী দেশীয় গরুর মূত্র ৫০০টাকা দরে জার্সি গরুর মূত্র ৩০০টাকা দরে এবং গোবর ২০০টাকা কেজি দরে বিক্রি শুরু করে। পরে অবশ্য সেই ব্যবসায়ীকে প্রশাসন গ্রেপ্তার করেছে।বিজেপি রাজ্য নেতাদের গোমূত্রের প্রতি বিশ্বাস বেড়েছে দিল্লিতে সাম্প্রতিককালে গোমূত্রের পার্টি হওয়ার পর। সেখানে জনে জনে মানুষকে গোমূত্র খাইয়েছেন হিন্দু মহাসভা সভাপতি স্বামী চক্রপানি। তিনি এও বলেছেন ,আমিষ ভোজিদের শাস্তি দিতেই ঈশ্বর এই ভাইরাস পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। বেশ কিছুদিন আগে সাধিকা সাধ্বী প্রজ্ঞা ক্যান্সার থেকে সুস্থ হয়ে বলেন, গোমূত্র খেয়েই নাকি তাঁর ক্যান্সার নিরাময় হয়েছে। অথচ তিনি আধুনিক চিকিৎসা করেছেন দীর্ঘদিন।উত্তরাখণ্ডের বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী টি এন রাওয়াত বলেছেন, গরুর নিশ্বাসে অক্সিজেন মেলে। অসমের বিজেপি বিধায়ক সুমন হরিপ্রিয়া বলেছেন, গোমূত্র আর গোবরে করোনা ভাইরাস নির্মূল হবে।দক্ষিণ ভারতে অনেক মানুষ কাউ থেরাপিতে বিশ্বাস রেখে গোবর মেখে রোজ স্নান করছেন।ধারণা ,করোনা সহ সব ভাইরাস মরবে।সোস্যাল মিডি য়ায় সেই সব খবর ও ছবি ভাইরাল হচ্ছে। বিভিন্ন মিডিয়া, বিজ্ঞান মঞ্চের সভ্যরা এবং চিকিৎসকেরা বিষয়টিকে কুসংস্কার আখ্যা দিচ্ছেন। বিরোধী দলের নেতারা বিজেপি নেতাদের পাগল, বিকৃত মস্তিষ্ক বলছেন। কিন্তু তথ্য বলছে, প্রথম শতাব্দীতে রোমানিয়রা দাঁত পরিষ্কার করতে গোমূত্র দিয়ে কুলকুচি করতেন। একবার ভুল করে কেউ সেই গোমূত্র গিলে ফেলেন। তার ছিল মাড়ির রোগ। সে মনে করে সেই রোগ সেরে গেছে গোমূত্র পানে। তারপর থেকে রোমে গোমূত্র পানের চল হয়। এই মুহূর্তে এদেশে বিজেপি নেতাদের গোমূত্র ও গোবরের প্রতি বিশ্বাস কিন্তু কুসংস্কার নয়, কেননা হিন্দু শাস্ত্রে গোমূত্র পান ও গোবর খাওয়ার নিদান আছে। সেক্ষেত্রে হিন্দু শাস্ত্রগুলিকে কুসংস্কার বলতে হয়। কিন্তু বিরোধীদলগুলি হিন্দুশাস্ত্রকে কুসংস্কার বলে হিন্দু ভোট খোয়াতে রাজি নন। তাঁরা কি সাহস করে বলবেন শাস্ত্রের নিদান কুসংস্কার? বলবেন না। ভোট বড় বালাই।
দেখা যাক কোন শাস্ত্রে গোমূত্র নিয়ে কি বলা হয়েছে। একথা ঠিক বেদ, উপনিষদ, রামায়ণ, মহাভারত বা গীতাতে গোমূত্র বা গোবর খাওয়ার ব্যাপারে কোনো বিধান না থাকলেও বিষ্ণু পুরাণে বলা হয়েছে গরুর মল, মূত্র, দুধ, দহি, ঘৃত পবিত্র।
স্মৃতি শাস্ত্রে সান্তপন ব্রতের কথা উল্লেখ আছে।সেখানে একাদশ অধ্যায়ে ১৭৪ তম শ্লোকে বলা হয়েছে, পশুতে কিম্বা রজস্বলা যোনি ভিন্ন কোনো জীবের সঙ্গে সঙ্গম করার শাস্তি মৃত্যু। সেক্ষেত্রে অভিযুক্ত যতদিন না মৃত্যু হয় ততদিন অগ্নিতে তপ্ত গোমূত্র পান করবে। এক অর্থে কিন্তু বোঝা যায় গোমূত্র বিষতুল্য। আবার শুক্ল যজুর্বেদের সন্ন্যাস উপনিষদের ভিক্ষকোপনিষদে চার ভিক্ষু সম্প্রদায়ের কথা উল্লেখ আছে। এদের অন্যতম হংস সন্ন্যাসী সম্প্রদায়। পুরাণে গৌতম, ভরদ্বাজ যাজ্ঞবল্ক ও বশিষ্ঠ ঋষিকে হংস সম্প্রদায় বলা হয়। এদের খাদ্য ও পানীয় তালিকায় গোমূত্র ও গোবর ছিল। শুধু তাই নয়, যুক্তরাজ্যে, দক্ষিণ এশিয়ার অনেক শহরে শিশিতে গোমূত্র বিক্রি হয় বহুদিন ধরে। ওয়াট ফোর্ডে হরে কৃষ্ণ মন্দিরে গোমূত্রের বোতল বিক্রি হয় রীতিমতো লেবেল মেরে। সেখানে হিন্দিভাষী প্রবাসী ভারতীয়রা শিশুর জন্মের পর এক বিশেষ ধর্মীয় অনুষ্ঠানে গোমূত্রের ব্যবহার করেন। কিছুদিন আগে পর্যন্ত নাইজেরিয়াতে শিশুদের খিঁচুনি রোগ সারাতে ওষুধের মূল উপাদানে গোমূত্রের ব্যবহার হতো।সেখানে দি ইউনিভার্সিটি কলেজ হসপিটাল ইবাদানে ১৯৭৫ সালে বিজ্ঞানী ওয়েবোলা ইঁদুরের ওপর পরীক্ষা অর্থাৎ ইঁদুরকে গোমূত্র খাইয়ে দেখেন ইঁদুর মরে যাচ্ছে। ১৯৭৬সালে কুকুরের ওপর পরীক্ষা চালিয়েও একই ফল পান। তারপর নাইজেরীয় প্রশাসন গোমূত্র ব্যবহার নিষিদ্ধ করে।পরীক্ষার ফলাফলে বলা হয়, গোমূত্রের টকসিসিটি মানব শরীরে প্রথমে উত্তেজনা ও শ্বাসকষ্ট সৃষ্টি করে। বেশি পরিমাণে খেলে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। সরাসরি গোমূত্রের উপাদানে আছে জৈব অণু, নুন, প্রোটিন, জৈব জ্বালানি, অ্যামিনো অ্যাসিড, কিছু ভিটামিনের অসাড় অংশ। গরু দিনে দশ বারো লিটার দুধ দিলেও মূত্র ত্যাগ করে বেশি হলে সাত লিটার। তাই ভারতে বেশ চড়া দরে গোমূত্র বিক্রি হয়। তবে ২০০২ সালে সি এস আই আর এতে ভারতীয় বিজ্ঞানীরা দল অ্যান্টিবায়োটিক যৌগে পরিস্রুত গোমূত্র মিশিয়ে এক মিক্সচার তৈরি করেন যা ডি এন এর অক্সিডেটিং ড্যামেজ সারায়।

সেতো সাপের বিষ থেকেও অনেক ওষুধ তৈরি হয়। তাই বলে কেউ তো সাপের বিষ খায় না। হিন্দু শাস্ত্রে আসন্নপ্রসবা গরুর মূত্র পানের নিদান আছে। সেক্ষেত্রেও গরুটি নানা রোগে আক্রান্তও হতে পারে। সেটিও ভয়ানক বিষাক্ত। সুতরাং বিজ্ঞান যখন করোনা ভাইরাসের প্রতিষেধক আবিষ্কারের জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে তখন পৌরাণিক কাহিনিনির্ভর বিশ্বাসকে বিজ্ঞান বলে দাবি করা কতটা স্বাভাবিক তা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন। সংবাদ সূত্র বলছে, ভারতে ই কমার্স সাইটে কাউ প্যাথি নামে এক কোম্পানির গোমূত্র দিয়ে তৈরি হ্যান্ড স্যানিটাইজার ও সাবান বিকোচ্ছে। কতটা তা পরীক্ষিত। প্রশাসন কি নজর রাখছে?

More from GeneralMore posts in General »

Be First to Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *