Press "Enter" to skip to content

উনিশ শতকের বাঙালি রেনেসাঁ ঐতিহ্যের শেষ বুদ্ধিজীবী হিসেবে যাঁর নাম উচ্চারণ করা হয়, তিনি আমাদের সকলের প্রিয় কবি ও সাহিত্যিক অন্নদাশঙ্কর রায়….

Spread the love

বাবলু ভট্টাচার্য: ঢাকা, উনিশ শতকের বাঙালি রেনেসাঁ ঐতিহ্যের শেষ বুদ্ধিজীবী হিসেবে যাঁর নাম উচ্চারণ করা হয়, তিনি অন্নদাশঙ্কর রায়। ১৯২৫ সালে তিনি পাটনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে অনার্সসহ বিএ পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হন। এমএ (ইংরেজিতে) শ্রেণিতে পড়াকালে ১৯২৭ সালে অন্নদাশঙ্কর রায় আইসিএস পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করে প্রশিক্ষণের জন্য চলে যান ইংল্যান্ডে। সেখানে তিনি লন্ডনের ‘ইউনিভার্সিটি কলেজ’, ‘কিংস কলেজ’, ‘লন্ডন স্কুল অব ইকনমিকস’, ‘লন্ডন স্কুল অব ওরিয়েন্টাল স্টাডিজ’-এ পড়াশোনা ও প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। এরই ফাঁকে ঘুরে বেড়ান সুইজারল্যান্ড, জার্মানি, ইটালি, ফ্রান্স প্রভৃতি দেশ। ফলে ভ্রমণের অভিজ্ঞতার প্রতিফলন ঘটে তাঁর সাহিত্যে। প্রশিক্ষণ শেষে ফিরে ১৯২৯ সালে অন্নদাশঙ্কর রায় যোগ দেন মুর্শিদাবাদ জেলার বহরমপুরে অ্যাসিসট্যান্ট ম্যাজিস্ট্রেট পদে।

১৯২৯ সাল থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত প্রায় ১৮ বছরের মধ্যে নয় বছর পশ্চিমবঙ্গে এবং নয় বছর পূর্ববঙ্গে বিভিন্ন পদে নিয়োজিত ছিলেন তিনি। অবিভক্ত বঙ্গের মুর্শিদাবাদ, বাঁকুড়া, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, ঢাকা, ময়মনসিংহ, কুষ্টিয়া, নদীয়া, ত্রিপুরা, মেদিনীপুর, হুগলি এবং হাওড়ায় তিনি নিযুক্ত ছিলেন কখনো শাসন বিভাগে, কখনো বিচার বিভাগে যথাক্রমে ম্যাজিস্ট্রেট ও জজ হিসেবে। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পর ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে তিনি উচ্চতর পর্যায়ের ইন্ডিয়ান অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিসের (আইএএস) সদস্য হিসেবে পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসন ও বিচার বিভাগে কাজ করেন। রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক বিষয়কে কেন্দ্র করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে মতবিরোধ হওয়ায় ১৯৫০ সালে পদত্যাগপত্র দেন এবং ১৯৫১ সালে বিচার বিভাগের সচিব পদ থেকে অব্যাহতি পান তিনি।চাকরি ছাড়ার পর অন্নদাশঙ্কর বসবাস শুরু করেন শান্তিনিকেতনে। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য বাঙালির আত্মদান তাঁর মনে গভীরভাবে রেখাপাত করে।

পরের বছর ১৯৫৩ সালে এক ঐতিহাসিক ‘সাহিত্য মেলা’র আয়োজন করেন তিনি শান্তিনিকেতনে। তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান থেকে এই সাহিত্য মেলায় যোগ দেন কাজী মোতাহার হোসেন, মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন, শামসুর রাহমান, কায়সুল হকসহ আরো অনেকে।ষাট দশকের শেষ দিকে পারিবারিক কারণে বসবাস শুরু করেন কলকাতায় এসে এবং সেখানেই স্থায়ীভাবে থেকে যান তিনি। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী অন্নদাশঙ্কর রায় ওড়িয়া সাহিত্যিক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন মাত্র ২০ বছর বয়সেই। তাঁর প্রথম কবিতা রচিত হয়েছে ওড়িয়া ভাষায়। অল্প বয়সেই বের করেন ‘প্রভা’ নামে ওড়িয়া ভাষায় হাতে লেখা একটি পত্রিকা। বাংলা, ইংরেজি, ওড়িয়া, সংস্কৃত, হিন্দি- সব ভাষায় পারদর্শী হলেও বাংলাকেই তিনি সাহিত্যচর্চার মাধ্যম হিসেবে বেছে নেন। প্রমথ চৌধুরী সম্পাদিত ‘সবুজপত্র’ ছিল অন্নদাশঙ্করের লেখক হয়ে ওঠার প্রেরণা। সবুজপত্র পত্রিকার দুই প্রধান লেখক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও প্রমথ চৌধুরীর জীবনদর্শন ও শিল্পাদর্শ তাঁর সাহিত্য-মানস গঠনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব বিস্তার করে। রবীন্দ্রনাথের ‘রক্তকরবী’ নাটকের ওপর যে প্রবন্ধ লেখেন, তা রবীন্দ্রনাথকেও আলোড়িত করে। অন্নদাশঙ্করের প্রথম প্রকাশিত প্রবন্ধ তারুণ্য ১৯২৮ সালে প্রকাশিত হয় বিচিত্রা পত্রিকায়। দীর্ঘজীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে প্রায় সত্তর বছর ধরে প্রবন্ধ, উপন্যাস, ছোটগল্প, ভ্রমণকাহিনী, ছড়া, কবিতা, নাটক, পত্রসাহিত্য, আত্মজীবনীমূলক রচনা প্রভৃতি লিখে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেন তিনি। সব মিলিয়ে তাঁর গ্রন্থের সংখ্যা বাংলায় ১২৩টি, ইংরেজিতে ৯টি এবং ওড়িয়া ভাষায় ৩টি। অন্নদাশঙ্কর রায়ের বাংলা ছড়াসম্ভার বিষয়বৈচিত্র্যে তাৎপর্যপূর্ণ প্রথম জীবনে রবীন্দ্রনাথ এবং পরে বুদ্ধদেব বসুর অনুরোধে তিনি শুরু করেন ছড়া লেখা। একসময়ের ছেলেভুলানো ছড়াকে তিনি উপেক্ষিত স্তর থেকে উন্নীত করেন অভিজাত সাহিত্যের শৈল্পিক স্তরে। তাঁর বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছড়া : ‘খোকা ও খুকু’ (১৯৪৭)। এতে সুর দিয়েছেন বিখ্যাত সুরকার সলিল চৌধুরী। দেশবিভাগজনিত বেদনা তীর্যকভাবে প্রকাশ পেয়েছে এই ছড়ায়- ‘তেলের শিশি ভাঙল বলে/খুকুর ’পরে রাগ করো,/তোমরা যে সব বুড়ো খোকা/ভারত ভেঙে ভাগ করো। তার বেলা?’ বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ১৯৭৪ সালে এবং ১৯৯৬ সালে অন্নদাশঙ্কর দুইবার বাংলাদেশ সরকারের অতিথি হিসেবে বাংলাদেশ সফর করেন।

সাহিত্যকর্মের জন্য তিনি বহু পুরস্কারে ভূষিত হন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে জগত্তারিণী পুরস্কারে ভূষিত করে ১৯৭৯ সালে। বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে প্রদান করে দেশিকোত্তম সম্মান। বর্ধমান, রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় ও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে প্রদান করে সম্মানসূচক ডিলিট উপাধি। অন্যান্য পুরস্কারের মধ্যে রয়েছে সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার (১৯৬২), আনন্দ পুরস্কার (১৯৮৩, ১৯৯৪), বিদ্যাসাগর পুরস্কার, শিরোমণি পুরস্কার (১৯৯৫), রবীন্দ্র পুরস্কার, নজরুল পুরস্কার, বাংলাদেশের জেবুন্নিসা পুরস্কার। ২০০২ সালের ২৮ অক্টোবর কলকাতায় অন্তিমশ্বাস ত্যাগ করেন এই বহুমুখী প্রতিভাধর মানুষটি।

অন্নদাশঙ্কর রায় ১৯০৪ সালের আজকের দিনে (১৫ মার্চ) উড়িষ্যার ঢেঙ্কানলে জন্মগ্রহণ করেন।

More from GeneralMore posts in General »

Be First to Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *