Press "Enter" to skip to content

আমরা কেন আওয়াজ তুলব না যে, স্বাস্থ্য খাতে, শিক্ষা খাতে বেশি পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ করতে হবে।

Spread the love

—————আর কবে বুঝব আমরা!————–
মধুমিতা শাস্ত্রী: ৯ জুন, ২০২০। করোনা ভাইরাসের আক্রমণ ও দেশব্যাপী লকডাউন আমাদের অনেক কিছু শেখাচ্ছে। কিন্তু আমারা কি শিখছি! বোঝার চেষ্টা করছি যে দেশের সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমাদের অবস্থানটা ঠিক কোথায়! সময় আমাদের কাছে একটা বড় সুযোগ এনে দিয়েছে। আমাদের তথাকথিত হিতৈষীদের চিনে নেওয়ার, আমরা কি চেষ্টা করছি সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করার?
কতিপয় মিডিয়ার বিভ্রান্তিকর ও প্রচারমূলক খবরে বিশ্বাস না করে তথ্য ঘেঁটে নিজের মতো বিশ্লেষণ করে বোঝার চেষ্টা করুন না তথাকথিত রাজনৈতিক নেতারা আদৌ আমাদের কতটা হিতৈষী!
স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় এত কম কেন?
করোনার আক্রমণ একটা বিষয় পরিষ্কার করে দেখিয়ে দিয়েছে যে, আমাদের দেশের সরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবা কতটা নিম্নমানের। যখন জরুরি প্রয়োজন তখন টেস্ট কিট পাওয়া যায় না। হসপিটালে প্রয়োজনীয় সংখ্যক শয্যা নেই। কমতি রয়েছে ভেন্টিলেটরের সংখ্যাতেও। যে কারণে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রীকে বাধ্য হয়েই ঘোষণা করতে হয় যে, দিল্লির হাসপাতালে শুধু দিল্লির বাসিন্দারাই ভর্তি হতে পারবেন যা সংবিধান বিরোধী একটি সিদ্ধান্ত।

স্বাস্থ্য খাতে আমাদের দেশের ব্যায় বরাদ্দ কত? এবছর স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ হয়েছে ৬৭ হাজার ৪৮৪ কোটি টাকা, যা জিডিপির ১ শতাংশের কম। পাশাপাশি যদি তুলনা করি তবে দেখা যাবে প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে আমাদের ব্যায় বরাদ্দ ৪ লক্ষ ৭১ হাজার ৩৭৮ কোটি টাকা। যা দেশের মোট ব্যায়ের ১৫.৪৯ শতাংশ। কেন এই বৈষম্য? অত্যাধুনিক যুদ্ধাস্ত্র আর দেশের নাগরিকদের সুস্বাস্থ্য, কোনটার গুরুত্ব বেশি? করোনা কিন্তু প্রমাণ করে দিল যুদ্ধাস্ত্রের থেকে ভেন্টিলেটরের প্রয়োজনই সর্বাধিক। একটা সময় বাজেট ঘোষণার পরই বিরোধীরা নিয়ম করে চিৎকার চেঁচামেচি করত, কেন স্বাস্থ্য খাতে, শিক্ষা খাতে ব্যায় বরাদ্দ এত কম! সংবাদ মাধ্যমগুলোতেও এ নিয়ে লেখালিখি হতো। কিন্তু ইদানীং না বিরোধীরা, না সংবাদ মাধ্যমগুলো কেউই এসব বিষয়গুলো গুরুত্ব সহকারে দেখে না। সাধারণ নাগরিকরাও তাই এসব নিয়ে ভাবনাচিন্তা করেন না। আর না ভেবেই সংবাদ মাধ্যমের উচ্চকিত প্রচারের কাছে মগজ বন্ধক রেখে ভোটটি তাকেই দিয়ে আসেন যাকে নিয়ে সংবাদ মাধ্যমগুলো বেশি নাচানাচি করে।
সাধারণ মানুষের কথা মনে রাখে না সরকার!
লকডাউন চলা সত্ত্বেও কীভাবে আক্রান্তের সংখ্যা এত বাড়ছে! একথা কি কারও মনে একবারও জেগেছে? সরকার কি বিশ্লেষণ করতে চেয়েছে এর কারণ? আসলে এ হল অপরিকল্পিত এক লকডাউনের ফল। মাত্র ৪ ঘণ্টার নোটিশে লকডাউন! এটা করার আগে দেশের সরকার কি একবারও ভেবেছিল পরিযায়ী শ্রমিকদের কথা। সম্ভবত সরকার জানতই না যে, দেশের বিভিন্ন রাজ্যে এত পরিযায়ী শ্রমিক রয়েছেন যাঁরা ন্যুনতম মজুরিতে কাজ করেন।

ফলে সরকার ভাবার মতো অবস্থাতেই ছিল না যে, এই লকডাউন তাদের জীবনে কী অন্ধকার ডেকে আনতে চলেছে। লকডাউন ঘোষণা করার আগে যদি এদের নিজেদের বাড়ি ফিরে যাওয়ার সুব্যবস্থা করা যেত তবে টানা দু’ মাস লকডাউন চলার পরও এভাবে করোনার সংক্রমণ বাড়ত না। নতুবা এরা যে যেখানে আছে সেখানেই যদি রেখে দেওয়া যেত এবং সরকার যদি তাদের খাওয়াপরার সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিত তবেও বোধহয় এই সংক্রমণ রোধ করা যেত। এখন তো একথা পরিষ্কার যে, নতুন করে যেসব সংক্রমিতের খবর আসছে তারা বেশিরভাগই পরিযায়ী শ্রমিক। এদের মাধ্যমেই সংক্রমণ ছড়াচ্ছে বেশি। যারা ভিন রাজ্য থেকে আসছেন তাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা নিয়মমাফিক হচ্ছে না। যে সব কোয়ারেন্টাইন সেন্টারগুলো চলছে সেগুলো বেশিরভাগেরই অবস্থা শোচনীয়। মানুষ সেখানে বিক্ষোভ দেখাচ্ছেন।তাছাড়া আর একটি কথাও মাথায় রাখতে হবে যে, আমাদের মতো গরিব দেশে যেখানে ৭-৮ জনের এক একটি পরিবার একটি মাত্র ঘরে গাদাগাদি করে বসবাস করে সেখানে লকডাউন কীভাবে মেনে চলবে মানুষ!
যার রুজিরোজগার বন্ধ তার লকডাউন মানলে চলবে কী করে! আমি দেখেছি, কেন্দ্রীয় সরকারের দেওয়া মহিলাদের অ্যাকাউন্টে মাসে ৫০০ টাকা সাহায্য তোলার জন্য ব্যাংকে মাইলের পর মাইল লম্বা লাইন পড়েছে। উজালা যোজনার গ্যাস নিতেও রোজই এরকম লম্বা লাইন। ‘প্রচেষ্টা’র ফর্ম জমা দেওয়ার জন্য বিডিও অফিসের সামনে হুড়োহুড়ি। এতে লকডাউনের কাঙ্খিত ফল পাওয়া যাবে কি? কী মনে হয় আপনাদের? লকডাউন সঠিকভাবে চালাতে চাইলে উচিত ছিল সরকারি সব সুবিধে, তা সে রেশন হোক বা গ্যাস তা মানুষের বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা। যাতে মানুষকে রাস্তায় নামতে না হয়। তবেই সুফল মিলত লকডাউনের। উচিত ছিল প্রত্যেক পরিবারের হাতে কিছু টাকা তুলে দেওয়া। যাতে তাকে রোজগারের জন্য লকডাউন ভেঙে পথে নামতে না হয়। শুধু তো চাল, ডাল দিয়েই সংসার চলে না। বাচ্চার দুধ, অসুস্থদের ওষুধ, সাবান, হ্যান্ড স্যানিটাইজার আর মাস্ক কিনতেও টাকা লাগে। এদিকে সরকার সমস্ত প্রচার মাধ্যমে আবেদন জানাচ্ছে সাবান, মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করতে। এসবের টাকা আসবে কোথা থেকে? আর লকডাউনের ফলে রাতারাতি সমস্ত জিনিসের মূল্য বৃদ্ধি ঘটেছে। এসবের টাকা আসবে কোথা থেকে? সেকথা ভেবেছে সরকার! আসলে সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ, সুবিধে-অসুবিধের কথাগুলো নেতা- মন্ত্রীদের মাথায় থাকে না। দিন আনা দিন খাওয়া মানুষগুলো কীভাবে জীবনধারণ করে তা সরকারের অজানা। অথচ মজার বিষয় হল এই গরিব মানুষগুলোই ভোটের সময় ভোট দিয়ে নেতা মন্ত্রীদের জিতিয়ে দিয়ে আসে। সাধারণ মানুষের দেওয়া করের টাকাতেই যে তাঁরা লালবাতি লাগানো গাড়ি চড়েন তা ভোটের পর বেমালুম ভুলে যান নেতা-মন্ত্রীরা।

আমরা কি বুঝব না তথাকথিত গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার এই খেলা? নাকি মগজকে বন্ধক রেখে বছরের পর বছর একইভাবে ভোট দিতে যাব। আর ভোটের পর কপাল চাপড়ে বলব, এ কাকে জেতালাম!
আমরা কেন আওয়াজ তুলব না যে, স্বাস্থ্য খাতে, শিক্ষা খাতে বেশি পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ করতে হবে। কেন আমরা আওয়াজ তুলব না যে, আগে দেশের মানুষের স্বার্থ, তারপর নেতামন্ত্রীদের বিলাসবহুল জীবনযাপন। আসুন করোনার আক্রমণ আমাদের সামনে যে সুযোগ এনে দিয়েছে তার পূর্ণ সদ্ব্যবহার করি।

More from GeneralMore posts in General »

Be First to Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *