Press "Enter" to skip to content

অনিন্দিতা সর্বাধিকারী স্মরণ করালেন প্রতি ৬৮মিনিটে যৌতুকের কারণে বধূরা আত্মহত্যা করে……

Spread the love

গোপাল দেবনাথ/ সুজিৎ চট্টোপাধ্যায়: ৩মার্চ ২০২০ পরিচালক অনিন্দিতা সর্বাধিকারী খুব বেশি একটা ছবি বানাননি। কিন্তু নিজের একটা আলাদা পরিচিতি তৈরি করে নিয়েছেন । তাঁর শিল্পীসত্ত্বা তাকে অনুপ্রাণিত করেছে সামাজিক
দায়বদ্ধতায়। তাই বোধহয় সুখী সুখী ফর্মুলা ছবি নয়, তিনি ছবি করেছেন সমাজের এক জ্বলন্ত সমস্যা নিয়ে । পণপ্রথার জঘন্য ফাঁদে মানসিক ও শারীরিক ভাবে অত্যাচারিত নারী আত্মহত্যা করছে। সমীক্ষার হিসেবে যা প্রতি মিনিটে ৬৮জন।সমীক্ষা আরও বলছে , পণপ্রথার বলি সেসব নারীদের তালিকায় পশ্চিমবঙ্গ
প্রথম।

নববধূদের বলির জন্য যারা দায়ী তাদের মধ্যে মাত্র ৩৫শতাংশ আইনতঃ শাস্তি পায়।সামাজিক এই ব্যাধির মুক্তি ঘটাতে প্রয়োজন জনসচেতনতা। সেই বেড়ালের গলায় ঘন্টা বাঁধার কাজটা নিজের কাঁধে নিলেন অনিন্দিতা।নির্মাণ করলেন একটি ৪০মিনিটের ছবি। যাকে
পরিচালক একটি আন্দোলন হিসেবে মনে করেন।নিঃসন্দেহে তাঁর বক্তব্য সঠিক।সামাজিক জ্বলন্ত সমস্যা নিয়ে কোনো চলচ্চিত্রকার যদি ক্যামেরাকে হাতিয়ার করে মাঠে নামেন তাকে তো আন্দোলন বলাই যায়।এটাও ঠিক, সমস্যা সমাধানের দ্বায়িত্ব পরিচালকের নয়, সে দ্বায়িত্ব বর্তায় আইনজ্ঞ,প্রশাসন,রাজনৈতিক নেতাদের ।

চলচ্চিত্রকার হিসেবে অনিন্দিতা যেটা করতে চেয়েছেন তা সিনেমার মতো জনপ্রিয় একটি মাধ্যমে একটি গল্প বলে একটি অনুভূতির চাবুক মেরেছেন। কাহিনীর শুরু চাকরিজীবী মিস্টার ভরদ্বাজ তার মেয়ের বিয়ে দিচ্ছেন তার যথাসাধ্য সামর্থ্য দিয়ে।নতুন জামাইকে দিয়েছেন আধুনিক মডেলের দামী গাড়িও।কিন্তু জামাইবাবাজির বাবা বিয়ের রাত্রে চেয়ে বসেন দশ লক্ষ টাকা।অসহায় মেয়ের বাবা তার অক্ষমতার কথা জানিয়েও মুক্তি পান না।মাছের বাজারের মতো দরাদরির শেষে সিদ্ধান্ত হয়,বিয়ের রাতে
মেয়ের বাবা দু লাখ দিয়ে নিস্তার পান। বাকি টাকা কিস্তিতে।

এই বাকি টাকাটা যে পরে মিলবে কেননা বন্ধকী হিসেবে নতুন বৌমা তো থাকছেই।তারপর ছেলেপক্ষের আকাশচুম্বী চাহিদার বলি হন স্বয়ং পাত্রীর বাবা।নিজের বসতবাড়িটিও বন্ধক দিতে হয়।ফলে নববধূ শ্বশুরবাড়ির চাহিদা না মেটানোয় প্রথমে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়।শেষ পরিণতি আত্মহত্যায় ।দীর্ঘ সময় মেয়ের লাশ নিতে মা বাবার লাশকাটা ঘরের সামনে অপেক্ষা। হঠাৎ সামাজিক আইনের বলে বলিয়ান হয়ে হাজির স্বামী শ্বশুর। মৃত্যুর পরেও ছাড় নেই। সেখানেও নিষ্প্রাণ নারী দেহের অধিকার বর্তায় শ্বশুরবাড়ির লোকজনের। শেষ দৃশ্যে দেখলাম নিঝুম রাতে রাজপথ দিয়ে বহুকষ্টে দৌড়ে পালাচ্ছেন ছবির মূল চরিত্র আত্মহননকারী নববধূ । পরণে তাঁর বিয়ের বসন ,বিয়ের ভূষণ।

৪০মিনিটের হিন্দি ভাষায় তৈরি এই ছবির নায়িকা কিন্তু শিক্ষিত। পি এইচ ডি। তবুসমাজ , লৌকিকতার নাগপাশে বন্দী মানসিকতা জয় করে মেয়েটি নিজের অস্তিত্ব রক্ষা করতে পারলো না।পাত্রীর বাবা লাশ কাটা ঘরে বসে ভাবেন আহা, মেয়ের বিয়ের যৌতুকের জন্য টাকা জমানো উচিত ছিল। এই উপলব্ধির ট্র্যাজিক পরিণতি তুলে ধরে পরিচালক সমাজের নগ্ন বাস্তব অবস্থা তুলে ধরেছেন। প্রথমে বলি ছবির অভিনেতা নির্বাচন যথার্থ। নায়িকা রিচা শর্মা,আদিল হুসেন, টোটা রায় চৌধুরী, ভরত কল, লাবণী সরকার ও চন্দন সেন চিত্রনাট্যের দাবি পূরণ করেছেন।

আবহ সঙ্গীত রচনায় বিক্রম ঘোষ, ক্যামেরায় মানস গাঙ্গুলি,সম্পাদনায় অর্ঘ্য কমল মিত্র,/এবং একটি মাত্র গানের গীতিকার মৃতুঞ্জয় কুমার সিং, সর্বোপরি ছবির কালারিস্ট দেবজ্যোতি ঘোষ প্রশংসার প্রাপ্য। বিশেষ করে লাশ কাটা ঘরে যে নীল রঙের আধিক্য দেখেছি তা মনে করিয়ে দেয় মৃত্যুর রং নীল।
অভিনন্দন প্রাপ্য কাহিনীকার ও চিত্রনাট্যকার অনিন্দিতার। অভিনন্দন প্রাপ্য প্রযোজকদ্বয় আদিল হুসেন ও লাল ভাটিয়ার। আদিল নিজে শিল্পী। আর লালজি শৈল্পিক ব্যবসায়ী। ব্যবসা করেন ব্যুটিক ওয়াইন,জলপাই আর জলপাই তেলের।ইতালির উৎপাদিত পণ্যের বিকিকিনির পাশাপাশি চিত্র প্রযোজনার আর্তি তাঁর শৈল্পিক মনের পরিচয় দেয়।

দহেজ, পণের বিরুদ্ধে জনমত তৈরিতে এই ছবি একটি পদক্ষেপ । কিন্তু সমাজ থেকে এই বিষ নির্মূল করতে মানসিকতা বদলানোর ক্ষেত্রে এই প্রচেষ্টা কি সমস্যার শিকড়ে পৌঁছতে পারবে ? সমাজ ছোট থেকে জেনে আসছে বিবাহিত নারী পুরুষ এর পরিচয় স্বামী স্ত্রী হিসেবে। স্ত্রী শব্দের অর্থ নারী।কিন্তু স্বামী ? স্বামী মানে মালিক। মালিকের নারী । মানে মালিকের দাসী। দাসী কর্তার প্রয়োজনের বস্তু। যে মেয়েটিকে ধর্মীয় বিধান মেনে কন্যাদান করা হয় সেই মেয়েটিকে কি করে প্রতিবাদ করার কথা বোঝানো যায়?
আজ হিন্দু বিবাহে মন্ত্রের নামে প্রয়োগ হয় কিছু বৈদিক মন্ত্র ।

যা আদৌ হিন্দু ধর্মের নয়। নেহাতই একটি সভ্যতার মন্ত্রগুপ্তি। যোগ করা হয়েছে কিছু লৌকিক আচার।
খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতাব্দী থেকে
প্রায় দেড় হাজার বছর পরে পর্যন্ত যেসব শাস্ত্র রচিত হয় তাতে নারীকে তার দেহের বা সম্পত্তির ওপর অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। বলা হয়েছে ন স্ত্রী স্বাতন্ত্র্য
মহর্তি। অর্থাৎ নারী স্বাধীনতার যোগ্য নয়।
এই প্রসঙ্গে সুকুমারী ভট্টাচার্য তাঁর বিবাহ প্রসঙ্গে বইতে (প্রকাশক ক্যাম্প)১৭ পৃষ্ঠায় লিখেছেন,,,,,,,,,সংবিধান। , তত্ত্ব ও প্রয়োগের মধ্যে বিস্তর
অসামঞ্জস্য থাকে,নারীর অধিকার।

খণ্ডিত হতে পারে সংবিধান বহির্ভূত পক্ষপাতিত্বে।(The effectiveness of the sanctions regulating sex expression of marriage and divorce is largely a reflection of woman’s economic power,Law,theory and practice are often widely at variance,woman’s right may be neglected by extra -legal discriminations, Encyclopaedia of SocialSicence,Vol.xv,p.443)
আর ওই পরাধীনতার অন্তরাল থেকে বিবাহকে নিয়ন্ত্রণ করে রাষ্ট্রশক্তি, প্রাচীনকালের শাস্ত্রের মাধ্যমে,পরে আইনের দ্বারা।

সন্তান পুরুষ হবে কি নারী হবে তার জন্য দায়ী পুরুষের এক্স ও ওয়াই ক্রোমোজোম। কিন্তু দায়ী হয় নারী। নারী শিশু জন্মাতে পারে তাই ভ্রূণ হত্যা।জন্মের পরও স্বামীর মায়ের সহযোগিতায় নুন দিয়ে ,গলা টিপে, মাটি চাপা দিয়ে সদ্যজাত নারী শিশু হত্যা হয়। নারীকে ভোগ্যপণ্য ভাবা,বা সন্তান উৎপাদনের যন্ত্র ভাবা শুধু আমাদের তৃতীয় বিশ্বে নয়, উন্নয়ণশীল দেশেও রয়েছে। আরব মিশরে শুধু নয়, জার্মানিতেও খুব জনপ্রিয় হয়েছে তাহারুশ জামাই খেলা। মেলা বা জনসমাগম পূর্ণ স্থানে দলবদ্ধভাবে কিছু পুরুষ একটি মেয়েকে বেছে নিয়ে যৌন নিপীড়ন চালায়। সমবেত জনতা উপভোগ করে।
বাইবেলের ওল্ড টেস্টামেন্টের আয়াতে লেখা আছে, এমন কিছু বক্তব্য, যাতে মেয়েদের দ্বিতীয়

শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।লেবিয় ১২:১ তে বলা হয়েছে ঋতুমতী মেয়ে অপবিত্র। ছেলে সন্তান প্রসব করলে সাতদিন অশুচি, মেয়ে সন্তান জন্মালে অশুচি ১৪দিন।ইসলামেও কোরআনে (সূরা নিসা ৩৪)তে বলা হয়েছে পুরুষ নারীর কর্তা, কারণ আল্লাহ তাদের এককে অপরের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন,,,,,,(সূরা বাকার:২২৩,) এ বলা হয়েছে তোমাদের (পুরুষ)স্ত্রী তোমাদের শস্যক্ষেত্র, তাই তোমরা তোমাদের শস্যক্ষেত্র যেভাবে খুশি প্রবেশ করতে পারো। মরক্কোর সংবিধানে বলা আছে স্ত্রী স্বামীর আইনি ক্রীতদাস। মহাভারতে অনুশাসন পর্বে ৩৮ এ বলা হয়েছে তুলাদন্ডের একদিকে যম, বায়ু, মৃত্যু, পাতাল, দাবানল, বিষ ও সাপ কে স্থাপন করে অপর দিকে নারীকে স্থাপন করলে উভয়ে সমান হবে। অনেকে বলেন ,আধুনিক যুগে পুরনো কাসুন্দি ঘেঁটে কি লাভ?

কিন্তু আমরা ভুলে যাই আজও বিয়ের পর নারীর গোত্রান্তর হয়।পদবী পাল্টে যায়, বাপের বাড়ি থেকে চলে গিয়ে স্থান হয় শ্বশুরবাড়িতে। নিজের বাড়ি বলে কিছু নেই। এই ছবির পরিচালক নিজেই স্বীকার করেছেন, স্পার্ম ব্যাংক থেকে শুক্রাণু কিনে সিঙ্গল মাদার হয়েছেন বটে কিন্তু পিতার নাম দিতে না পারার জন্য ছেলেকে ভালো স্কুলে ভর্তি করতে সমস্যায় পড়েছেন। ৮ মার্চ নারী দিবস। গত বছর নারী দিবসের দুদিন আগে ৬মার্চ সভ্যতার মক্কা ইংল্যান্ডে নারীদের ভোটাধিকারের শতবর্ষ উপলক্ষে এক আলোচনা সভা হয়। প্যারিসের ডিডেরট ইউনিভার্সিটির উইমেন্স হিস্ট্রি অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ এর অধ্যাপক মরীয়ম বৌসাই বাব্রাভার্ড বলেন, একশো বছর আগে যা হয়েছিল তা হলো আনুষ্ঠানিক সমতা। দরকার বাস্তব সমানাধিকার। যা ইংল্যান্ড কেন, কোনও দেশের মহিলারাই পাননি ।

পণপ্রথার মত অবমাননাকর রীতিও নারীর মানসিক ধর্ষণের নামান্তর। যুগ যুগ ধরে যা হয়ে আসছে। ইতিহাস বলছে, বিবেকানন্দের জন্য মেয়ে দেখছিলেন পিতা বিশ্বনাথ দত্ত। আর্থিক অবস্থা তখন তাঁর ভালো নয়। বিডন স্ট্রীটে মেয়ে দেখতে যান। পাত্রীর গায়ের রং ছিল কালো। তাই কন্যাদায়গ্রস্থ পিতা বিবেকানন্দকে বিলেতে ব্যারিস্টারি পড়াতে চেয়েছিলেন। সঙ্গে নগদ ১০ হাজার টাকা। যদিও বিবেকানন্দের সেই মেয়ে পছন্দ হয় নি তাই সেই পণের বিয়ে হয় নি।

সুতরাং সমস্যার মূল ধরে নাড়া দেওয়ার সাহস কেউ দেখাতে চাইলেও পারা কঠিন। কেননা ধর্মীয় বিধান মানুষের মনে নারীকে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক ভাবার যে অবচেতন ধারণা পুঞ্জীভূত করে তার বিরুদ্ধে বলতে গেলে ছবির সেন্সর মেলা কঠিন হয়ে পড়বে। সুতরাং?
সাত মণ তেলও পুড়বে না, রাধাও নাচবে না। তাহলে? সিদ্ধান্তের দায়িত্বটা না হয় পাঠকরাই নিন।

More from GeneralMore posts in General »

Be First to Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *