Press "Enter" to skip to content

অজয় কর বাংলা চলচ্চিত্রের সব্যসাচী….।

Spread the love

প্রবীর রায় : চলচ্চিত্র প্রযোজক, পরিচালক ও অভিনেতা। কলকাতা, ২৭ মার্চ, ২০২৪। গত শতকের ৩০-এর দশকে বেশ কয়েকজন আলোকচিত্রশিল্পী (cinematographer ) বাংলা চলচ্চিত্রের পর্দায় তাঁদের কৃতকৌশলে একটা ভিন্ন চেহারা আনার চেষ্টা করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন বিভূতি দাস, বিমল রায়, বিভূতি লাহা, যতীন দাস প্রমুখেরা। সেই সারিতে আরেকজন cinematographer ৩০-এর দশকের শেষ দিকে উপস্থিত হলেন। ১৯৩৯-এ চারু রায়ের পথিক ছবিতে তিনি ক্যামেরাম্যান হিসেবে প্রথম আত্মপ্রকাশ করলেন। তিনি সেই ছবিতে প্রথমবার back projection ব্যবহার করলেন।

… অজয় করের সেই শুরু…

অজয় করের জন্ম ২৭শে মার্চ ১৯১৪ কলকাতায়। বাবা ডঃ প্রমোদ চন্দ্র কর, মা সুহাসিনী দেবী। ১৯২৯-এ মুর্শিদাবাদের নবাব বাহাদুর ইনস্টিটিউট থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করে যাদবপুরে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার জন্য ভর্তি হন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পড়া হলো না। এক বছর পরে পড়ার পাট চুকিয়ে ছবি তোলার আকর্ষণে ক্যামেরার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুললেন। ১৯৩২-এ মামা ডাক্তার সতীশচন্দ্র ঘোষের সূত্রে পরিচিত হলেন ম্যাডান থিয়েটারের সঙ্গে। কয়েক মাস রাধা স্টুডিওতে কাজ করে ১৯৩৭-এ অজয় কর যোগ দিলেন ইন্দ্রপুরী স্টুডিওতে।

১৯৩৯-এ চারু রায়ের পথিক ছবিতে তাঁর প্রথম কাজ। তারপর ১৯৪৮ পর্যন্ত তিনি অসংখ্য ছবির ক্যামেরাম্যান। উল্লেখযোগ্য ছবি নীরেন লাহিড়ির গরমিল, প্রেমেন্দ্র মিত্রের সমাধান, শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের শহর থেকে দূরে, হেমেন গুপ্তের ভুলি নাই, দেবকী বসুর চন্দ্রশেখর, নীরেন লাহিড়ির ভাবীকাল প্রমুখ। “ভুলি নাই” ছবিতে বিকাশ রায় অভিনীত মহানন্দ নামে এক বিশ্বাসঘাতকের জটিল মানসিক অবস্থা বোঝাতে অজয় কর প্রথাগত ৭৫ বা ১০০ মিলিমিটার লেন্সের বদলে ব্যবহার করেছিলেন ২৫ মিলিমিটার ওয়াইড অ্যাঙ্গেল লেন্স। খুব কাছে বসিয়ে মহানন্দের মুখের অভিব্যাক্তি তোলা হয়েছিল। তাঁর বৈশিষ্ট্য ছিল পরিস্থিতি অনুযায়ী চরিত্রের ক্লোজ-আপের ব্যবহার।

১৯৪৯-এ শ্রীমতি পিকচার্সের অনন্যা ছবিতে তিনি প্রথম পরিচালনার দায়িত্ব পান। একই বছরে শ্রীমতি পিকচার্সের বামুনের মেয়ে ছবিটিও পরিচালনা করেন। ১৯৫০-এ প্রথম স্বনামে ছবি পরিচালনা করলেন… বিকাশ রায়, শিল্প-নির্দেশক বীরেন নাগকে নিয়ে জিঘাংসা। রহস্যঘন কাহিনীর বিশ্বস্ত চিত্ররূপ। এই ছবিটি তাঁকে পরিচালক হিসেবে একটি স্থায়ী আসন করে দিল। এই ছবিতে অন্যতম শব্দগ্রাহক ছিলেন তপন সিংহ, Operating cameraman ছিলেন বিমল মুখোপাধ্যায়। প্রখ্যাত আলোকচিত্রশিল্পী শক্তি বন্দোপাধ্যায় জিঘাংসার কাজ দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে মনে মনে তাঁকে শিক্ষক মেনে ক্যামেরাম্যান হয়েছিলেন। সঙ্গীতশিল্পী গীতা দত্তের ভাই মুকুল রায় (গীতিকার) অজয় বাবুকে বোম্বে নিয়ে গিয়ে গুরু দত্তের ইউনিটে যোগ দেওয়ান। কিন্তু বোম্বেতে ভালো না লাগায় অজয় কর ফিরে এলেন কলকাতায়।

এরপর তাঁর প্রথম ছবি ১৯৫৪-তে গৃহপ্রবেশ। এই ছবিতে তিনি নিলেন উত্তম-সুচিত্রা জুটিকে। তারপর তুমুল সাফল্য পেলেন ১৯৫৬-তে শ্যামলী ছবিতে। ১৯৫৬-তে উত্তমকুমার আর আলো সরকারকে নিয়ে তৈরি করলেন “আলোছায়া প্রোডাকশান্স”। এই ব্যানারেই তৈরি হল হারানো সুর। বিপুল জনপ্রিয়তা পেলেন।

অজয় কর বাংলা সাহিত্যনির্ভর অসামান্য সব ছবি তৈরি করেছেন-  মাল্যদান, নৌকাডুবি, বিষবৃক্ষ, সপ্তপদী, অতল জলের আহবান, কাঁচকাটা হীরে, শুন বরনারী, বর্ণালী, সাত পাকে বাঁধা, পরিণীতা, দত্তা প্রমুখ। তাঁর চলচ্চিত্রে কাহিনীর রাশ কখনও আলগা হয় না। তাঁর বেশীর ভাগ ছবির চিত্রনাট্য তিনি করেননি। তাঁর অনেক ছবির চিত্রনাট্য অন্য পরিচালকের করা যেমন সলিল সেন, হীরেণ নাগ। পরিণীতা ও কাঁচ কাটা হীরে ছবির চিত্রনাট্য লিখেছিলেন যথাক্রমে পার্থপ্রতিম চৌধুরী এবং মৃণাল সেন।

অজয় করের ছবির আরেক সম্পদ হচ্ছে তাঁর ক্যামেরার ব্যবহার। বহু ছবিতে আলোর অনবদ্য ব্যবহারে ক্যামেরার ফ্রেমে যেসব মুহুর্ত সৃষ্টি হয়েছে, তা চলচ্চিত্রে সম্পদ হয়ে আছে। শক্তি বন্দোপাধ্যায় বলেছেন – “ নিজে পরিচালক থাকাকালীন সহকারীদের ক্যামেরার দায়িত্ব দিলেও কোন light scheme – এ contrast ratio কি থাকবে, সেটা বলে দিতেন। তাঁর নিয়মই ছিল নায়ক-নায়িকার মুখ থেকে আলো কখনও সরে যাবে না। Realistic lighting সব সময় করতেন না।“ এই lighting , এই photography হলিউডের একটা স্টাইল।

তিনি একবার বলেছিলেন- “ সপ্তপদী ছবিতে ওথেলো আর ডেসডিমোনা –দুটি চরিত্রে দু রকম লাইটিং করেছিলাম। ডেসডিমোনার ক্ষেত্রে আলো ও লেন্স ব্যবহার করা হয়েছিল বেশীর ভাগ ১০০ মিলিমিটার ফোকাল লেন্স। ওথেলোর ক্ষেত্রে ২৫ আর ১৮ মিলিমিটার লেন্স ব্যবহার করেছিলাম তার অন্তর্দ্বন্দ ফুটিয়ে তোলার জন্যে।“ এই ছবিতে যুদ্ধক্ষেত্রে হাসপাতালের যে ছবি তৈরি করেছিলেন সেখানে আলোর ব্যবহার চোখ টানে। রীনা ব্রাউন যখন ডাক্তারের মুখ আয়নায় প্রতিফলিত হতে দেখে, , তখন ছোট আয়নায় কৃষ্ণেন্দুর মুখ যেভাবে ঝাঁকুনিতে কাঁপতে থাকে, তা সম্পুর্ণ রূপেই সিনেম্যাটিক।

ক্যামেরার কাজে তাঁর উপলব্ধি চলচ্চিত্রের স্কোয়ার ফ্রেমকে ছাড়িয়ে ছবি নির্মাণের বিস্তৃত পরিসরে ছড়িয়ে যায়। দর্শকদের রুচি তৈরিতে অজয় করের মতো পরিচালকের এক বিরাট ভূমিকা আছে। ক্যামেরার মাধ্যমে গল্প বলার এই অন্যতম স্থপতিকে জন্মদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি।

More from Writer/ LiteratureMore posts in Writer/ Literature »

Be First to Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *