ডাঃ দীপালোক বন্দ্যোপাধ্যায় : কলকাতা, ২২ আগস্ট, ২০২৫।
গল্পটির চরিত্রগুলি – শরণ – এক তরুণ তান্ত্রিক, বহু বছর সাধনা করেও সিদ্ধিলাভ করতে পারেনি। জগদানন্দ – তার গুরু, প্রবীণ সাধক, শরণকে দীক্ষা দিয়েছিলেন। ভোলা – শ্মশানে কাজ করা এক শ্মশানকর্মী, সরলমনা কিন্তু কুসংস্কারপ্রবণ।
কৌশিকী দেবী – মা তারা, যিনি কৌশিকী রূপে আবির্ভূত হন।
ভক্তসমাজ – সাধারণ পূণ্যার্থী ও তান্ত্রিকরা, যাঁরা তারাপীঠে সমবেত হন ।
গল্প:- ১. শ্মশানের ধারে:- ভাদ্র মাসের অমাবস্যা। আকাশে চাঁদ নেই, কেবল দ্বারকা নদীর কালো স্রোতে ভেসে বেড়ানো জ্যোৎস্নার মতো প্রদীপ। তারাপীঠ মহাশ্মশানে হাজার হাজার ভক্ত সমবেত হয়েছে। কেউ ভোগ দিচ্ছে, কেউ শ্মশানঘাটে চিতার আগুন জ্বালাচ্ছে।
ভোলা ফিসফিস করে বলল— “আজকের রাত অন্যরকম, বাবু। এই রাতে নাকি শ্মশানের আকাশে নীল আলো নাচে, ডাকিনী-যোগিনীরা ঘোরাফেরা করে।”
শরণ চোখ বন্ধ করে বলল— “ভোলা, ভয় পেও না। আজ কৌশিকী অমাবস্যা। এই রাতেই সিদ্ধি পাওয়া যায়। মা যদি কৃপা করেন, আমার সাধনা সফল হবে।”
ভোলা মাথা নাড়ল—“মা কৃপা করুন বাবু, তবে খেয়াল রেখো, ব্যর্থ হলে পাগল হয়ে যেও।”
২. গুরুজনের আশীর্বাদ :- শরণ তার গুরু জগদানন্দের কাছে গেল। গুরু কুঁজো হয়ে বসে ধূপ দিচ্ছিলেন।
জগদানন্দ বললেন—
“শরণ, আজ তোমার জীবনের পরীক্ষা। পঞ্চমুণ্ডির আসনে বসবে, কিন্তু মনে রাখবে—অহংকারে নয়, ভক্তিতে জয় হয়। মা যেমন শিবকে তারণ করেছিলেন, তেমনি তিনিই তোর মুক্তির পথ।”
শরণ গুরুদেবের পায়ে হাত রেখে বলল—
“গুরুদেব, আমি শুধু মায়ের নাম জপ করতে চাই। সিদ্ধি চাই, কিন্তু নিজের জন্য নয়, মানুষের দুঃখ লাঘব করতে চাই।”
গুরু মৃদু হেসে বললেন—
“তাহলেই তুই সঠিক পথে আছিস। যাও, মা কৌশিকী তোকে দর্শন দেবেন।”
৩. পঞ্চমুণ্ডির আসন
মধ্যরাত। শরণ শ্বেতশিমূল বৃক্ষের তলায় বসেছে। সামনে সাজানো—সাপ, শেয়াল, ব্যাঙ, খরগোশ আর মানুষের মুণ্ড। চারপাশে ধূপের ধোঁয়া।
সে জপ করতে লাগল—
“ॐ তারে তুত্তারে তুরে স্বাহা…”
হঠাৎ কানে এলো ভয়ার্ত শব্দ—কুকুর ডাকছে, পেঁচা উড়ছে, কোথাও যেন মরা মানুষের ক্রন্দন। শরণ ঘামতে লাগল।
“মা… তুমি আছো তো?”—সে ফিসফিস করে বলল।
৪. দেবীর আবির্ভাব
হঠাৎ ঠান্ডা বাতাস এলো। আগুন নিভে গেল। ধোঁয়ার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছেন এক কৃষ্ণবর্ণা দেবী, চার হাত, গলায় নরমুণ্ডের মালা, দেহে বাঘছাল। চোখদুটো অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মতো।
দেবী বললেন—
“ভয় করিস না শরণ। আমি দেবী কৌশিকী। বল, কী চাই তুই? ধনাত্মক শক্তি নাকি ঋণাত্মক?”
শরণ কাঁপা গলায় বলল—
“মা… আমি কিছু চাই না। আমি শুধু তোমার সেবা চাই। শক্তি চাই মানুষের দুঃখ দূর করতে।”
দেবী হেসে বললেন—
“যে ভক্ত নিজের জন্য কিছু চায় না, সে-ই সত্যিকারের সিদ্ধ। দেখ।”
শরণ দেখল—দেবী তাঁর বাম কোলে শিশুরূপ মহাদেবকে নিয়ে স্তন্যদান করছেন। অঝোর অশ্রু গড়িয়ে পড়ল শরণের চোখে।
“আজ থেকে তুই আমার সন্তান। তুই মানুষের দুঃখে পাশে দাঁড়াবি। মনে রাখ, আমি তারিণী—শিবকে যেমন তারণ করেছি, তোর দ্বারাও বহু মানুষ মুক্তি পাবে।”
৫. ভোরের আশ্চর্য
ভোর হলে ভক্তরা দেখল—শরণ শ্বেতশিমূল বৃক্ষের তলায় অচেতন অবস্থায় পড়ে আছে, কিন্তু তার মুখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি।
ভোলা ছুটে এসে বলল—
“বাবু! তুমি বেঁচে আছো?”
শরণ চোখ মেলে বলল—
“আমি বেঁচে আছি ভোলা। মা আমাকে স্পর্শ করেছেন। আজ থেকে আমি শুধু তাঁর নাম জপ করব, মানুষের সেবা করব।”
জগদানন্দ গুরু মৃদু চোখে বললেন—
“সার্থক হলো তোর সাধনা। কৌশিকী অমাবস্যা আবার প্রমাণ করল—মা এখনও তাঁর সন্তানদের কৃপা করেন।”
শ্মশানের আগুন নিভে এলো, দ্বারকা নদীর জলে ভেসে উঠল ভক্তদের একস্বর ধ্বনি—
“জয় তারা, জয় বাম, জয় কৌশিকী মা!”





















Be First to Comment