Press "Enter" to skip to content

ক্ষুদিরাম বসু তাঁর প্রাপ্তবয়সে পৌঁছানোর অনেক আগেই একজন ডানপিটে, বাউণ্ডুলে, রোমাঞ্চপ্রিয় হিসেবে পরিচিত লাভ করেন…..।

শহীদ ” ক্ষুদিরাম বসু “।
——————————–
ডাঃ দীপালোক বন্দোপাধ্যায় : ৩ ডিসেম্বর ২০২১।।  জন্ম – ৩ রা ডিসেম্বর ,১৮৮৯ ,মোহবনী , মেদিনীপুর
ফাঁসিতে মৃত্যু – ১১ই আগস্ট ১৯০৮, কলকাতা ৷
তখন বয়স -১৮বছর ৭মাস ১১ দিন ৷ তাঁর বাবা ত্রৈলোক্যনাথ বসু ছিলেন নাড়াজোলের আয় এজেন্ট বা তহশিলদার । তাঁর মা লক্ষীপ্রিয়া দেবী। তিন কন্যার পর তিনি তাঁর মায়ের চতুর্থ সন্তান। তাঁর দুই পুত্র আগেই মৃত্যুবরণ করেন। অপর পুত্রের মৃত্যুর আশঙ্কায় তিনি তখনকার সমাজের নিয়ম অনুযায়ী তার পুত্রকে তাঁর বড় বোনের কাছে তিন মুঠো খুদের (শস্যের খুদ) বিনিময়ে বিক্রি করে দেন। খুদের বিনিময়ে কেনা বলে শিশুটির নাম পরবর্তীকালে ক্ষুদিরাম রাখা হয়। ক্ষুদিরাম বসু ছেলেবেলায় বাবা – মাকে হারানোয় বড়দি অপরূপা দেবীর কাছেই বড় হন ৷
ক্ষুদিরাম বসু তাঁর প্রাপ্তবয়সে পৌঁছানোর অনেক আগেই একজন ডানপিটে, বাউণ্ডুলে, রোমাঞ্চপ্রিয় হিসেবে পরিচিত লাভ করেন। ১৯০২-০৩ খ্রিস্টাব্দ কালে যখন বিপ্লবী নেতা শ্রী অরবিন্দ এবং সিস্টার-নিবেদিতা মেদিনীপুর ভ্রমণ করে জনসম্মুখে বক্তব্য রাখেন এবং বিপ্লবী দলগুলোর সাথে গোপন পরিকল্পনা করেন, তখন তরুণ ছাত্র ক্ষুদিরাম বিপ্লবে যোগ দিতে অনুপ্রাণিত হন। ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দে ক্ষুদিরাম তাঁর বোন অপরূপার স্বামী অমৃতের সাথে তমলুক শহর থেকে মেদিনীপুরে চলে আসেন।
ক্ষুদিরাম বসু তমলুকের হ্যামিল্টন স্কুল এবং মেদিনীপুর কলেজিয়েট স্কুলে তিনি শিক্ষালাভ করেন।
মেদিনীপুরে তাঁর বিপ্লবী জীবনের অভিষেক। তিনি বিপ্লবীদের একটি নবগঠিত আখড়ায় যোগ দেন। ১৯০২ সালে জ্ঞানেন্দ্রনাথ বসু এবং রাজনারায়ণ বসুর প্রভাবে মেদিনীপুরে একটি গুপ্ত বিপ্লবী সংগঠন গড়ে উঠেছিলো। সেই সংগঠনের নেতা ছিলেন হেমচন্দ্র দাস কানুনগো এবং সত্যেন্দ্রনাথ বসু ছিলেন হেমচন্দ্র দাসের সহকারী। এটি রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় ব্রিটিশবিরোধীদের দ্বারা পরিচালিত হতো। অল্প কিছু সময়ের মধ্যেই ক্ষুদিরাম তার গুণাবলীর জন্য সবার চোখে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেন। বীর ক্ষুদিরাম সত্যেন্দ্রনাথের সাহায্যে বিপ্লবী দলভুক্ত হয়ে সেখানে আশ্রয় পান। ক্ষুদিরাম তাঁরই নির্দেশে “সোনার বাংলা” শীর্ষক বিপ্লবাত্মক ইশতেহার বিলি করে গ্রেপ্তার হন। ১৯০৬ সালে কাঁসাই নদীর বন্যার সময়ে রণপার সাহায্যে ত্রাণকাজ চালান।


ক্ষুদিরাম বসু তাঁর শিক্ষক সত্যেন্দ্রনাথ বোস এর নিকট হতে এবং শ্রীমদ্ভগবদগীতা পড়ে ব্রিটিশ উপনিবেশের বিরুদ্ধে বিপ্লব করতে অনুপ্রাণিত হন। তিনি বিপ্লবী রাজনৈতিক দল যুগান্তরে যোগ দেন। ১৬ বছর বয়সে ক্ষুদিরাম বিহারের মজফরপুরে কলকাতার চিফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট অত্যাচারী কিংসফোর্ডকে হত্যা করতে বোমা ছুড়লে ভুল করে উকীল কেনেডির স্ত্রী ও মেয়েকে মেরে ফেলেন ৷প্রফুল্ল চাকি আত্মহত্যা করলেও ঐ বোমা হামলার দায়ে ৩ বছর পর তাঁকে আটক করা হয়। ৩০ এপ্রিল ১৯০৮-এ মুজফফরপুর, বিহারে রাতে সাড়ে আটটায় ইওরোপিয়ান ক্লাবের সামনে বোমা ছুঁড়ে তিনজনকে হত্যার দায়ে অভিযুক্ত ক্ষুদিরামের বিচার শুরু হয় ২১ মে ১৯০৮ তারিখে যা আলিপুর বোমা মামলা নামে পরিচিত হয়। আইনজীবী সতীশচন্দ্র চক্রবর্তীকে তিনি বলেছিলেন ,”রাজপুত রমনীরা যেমন নির্ভয়ে আগুনে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করত , আমিও নির্ভয়ে দেশের জন্য প্রাণ দেব “৷ বিচারক ছিলেন জনৈক বৃটিশ মি. কর্নডফ এবং দুইজন ভারতীয়, লাথুনিপ্রসাদ ও জানকীপ্রসাদ। রায় শোনার পরে ক্ষুদিরামের মুখে হাসি দেখা যায়। তার বয়স খুব কম ছিল। বিচারক কর্নডফ তাঁকে প্রশ্ন করেন, তাকে যে ফাঁসিতে মরতে হবে সেটা সে বুঝেছে কিনা? ক্ষুদিরাম আবার মুচকে হাসলে বিচারক আবার প্রশ্নটি করেন। তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় ভোর ছয় টায়। ফাঁসির মঞ্চ ওঠার সময়ে তিনি হাসিখুশি ছিলেন৷ নিয়মমত কারা কতৃপক্ষ তাঁর শেষ ইচ্ছা জানতে চাইলে বলেছিলেন ,” আমি ভালো বোমা বানাতে পারি , মৃত্যুর আগে সমস্ত ভারতবাসীকে তা শিখিয়ে দিয়ে যেতে চাই”। ক্ষুদিরামকে নিয়ে কাজী নজরুল ইসলাম কবিতা লিখেছিলেন এবং অনেককবি প্রচুর গান লিখেছিলেন৷ এমন এক অজ্ঞাত চারণ কবির লেখা ( কেউ বলেন বাঁকুড়ার লোক কবি পীতাম্বর দাসের আবার কেউ বলেন চারণ কবি মুকুন্দ দাসের লেখা ৷ ১৯৬৬ সালে প্রচলিত এই গানটি “সুভাষচন্দ্র” ছবিতে লতা মঙ্গেশকর গিয়েছিলেন )গান “একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি “আজও আমাদের মুখে মুখে ফেরে ৷ এমন ফাঁসির মঞ্চে গাওয়া জীবনের জয়গান ৷
” লক্ষ পরাণে শঙ্কা না জানে
না রাখে কাহারো ঋণ ,
জীবন মৃত্যু পায়ের ভৃত্য
চিত্ত ভাবনা হীন ৷”
ক্ষুদিরাম বসু সম্পর্কে হেমচন্দ্র কানুনগো লিখেছেন যে ক্ষুদিরামের সহজ প্রবৃত্তি ছিল প্রাণনাশের সম্ভাবনাকে তুচ্ছ করে দুঃসাধ্য কাজ করবার।তাঁর স্বভাবে নেশার মতো অত্যন্ত প্রবল ছিল সৎসাহস। আর তাঁর ছিল অন্যায় অত্যাচারের তীব্র অনুভূতি। সেই অনুভূতির পরিণতি বক্তৃতায় ছিলো না বৃথা আস্ফালনেও ছিল না; অসহ্য দুঃখ-কষ্ট, বিপদ-আপদ, এমনকি মৃত্যুকে বরণ করে, প্রতিকার অসম্ভব জেনেও শুধু সেই অনুভূতির জ্বালা নিবারণের জন্য, নিজ হাতে অন্যায়ের প্রতিবিধানের চেষ্টা করবার ঐকান্তিক প্রবৃত্তি ও সৎসাহস ক্ষুদিরাম চরিত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য। আজ অকুতোভয় বিপ্লবীর জন্মদিনে আমার শ্রদ্ধার্ঘ্য !

More from GeneralMore posts in General »

Be First to Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *