Press "Enter" to skip to content

দুর্গা মায়ের “সন্ধি পূজা”……।

ডাঃ দীপালোক বন্দ্যোপাধ্যায় : ১৩ অক্টোবর ২০২১।
আশ্বিনের শুক্লা অষ্টমী ও নবমীর সন্ধিক্ষণে দুর্গা
পূজার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিধি “সন্ধি পূজা” পালিত হয়।  সন্ধি মানে মিলন ৷ এই সময় আমরা দেবীকে কালীর আরেক রূপ “চামুন্ডা” রূপে পুজো করি ৷ স্বর্ণ বর্ণা দেবী দুর্গা যখন মহিষাসুরের সঙ্গে
যুদ্ধে লিপ্ত তখন লড়াইয়ের বিধি ভেঙ্গে মহিষাসুরের দুই সৈনিক তথা বন্ধু চন্ড ও মুন্ড পিছন থেকে মাকে আক্রমন করে ৷ এতে মা দুর্গা রেগে রুদ্র মূর্তি ধারন করেন ৷ ত্রিনয়ন থেকে বাষ্প বের হয় ও সেখানে কৃষ্ণবর্ণা  চামুন্ডা দেবীর আর্বিভাব হয় ৷
অষ্টমীর শেষ ২৪ মিনিট ও নবমীর প্রথম ২৪ মিনিটের এই মহেন্দ্রক্ষণে ঐ কৃষ্ণ বর্ণা ভীষনা দেবী
চন্ড ও মুন্ড নামের দুই রাক্ষসের সঙ্গে যুদ্ধে নামেন ও তাদের খড়্গ দিয়ে মাথা কেটে নিহত করেন ৷
আমাদের পুজোর বেশীর ভাগই প্রতীকি ৷ চন্ড ও মুন্ড ধর্মীয় তত্বে মানুষের প্রবৃত্তি ও নিবৃত্তির প্রতীক ৷ চন্ড ও মুন্ডের নাম থেকে এই দেবীর নাম হয় চামুন্ডা ৷ সন্ধি পুজোয় চামুন্ডা দেবীর পুজো হয় ৷ এই বিশেষ সময় রামচন্দ্র দেবী পুজোয় একটি পদ্ম কম পড়ায় নিজের একটি চোখ দেবীর উদ্দেশ্যে তীর নিক্ষেপ করে সর্মপন করতে যান৷ আসলে , যুদ্ধে দেবীর ১০৮ জায়গায় ক্ষত সৃষ্টি হয়েছিল ৷ সে দেখে শিবের অশ্রুপাত হয় ৷ রামচন্দ্র অকাল বোধন করে দুর্গা পুজো করার সময় ১০৮টি পদ্মের খোঁজে হনুমানকে দেবীদহে পাঠালে ১০৭টির মাত্র পদ্ম পান ৷ আসলে দেবীদহে স্নানে ক্লান্ত আহত দেবীর ক্ষত দূর হয় ৷ সেই ক্ষতগুলি থেকে সেখানে পদ্ম ফোটে ৷ একটা ফুটেছিল শিবের অশ্রু থেকে ৷ শিবের অশ্রুর পদ্মতো মা চরণে গ্রহন করতে পারেন না ৷ সেকারনে ঐ পদ্মটি তিনি নিজে লুকিয়ে সঙ্গে নিয়ে যান। অন্যদিকে , দেবী পূজার বিধি ১০৮টি পদ্ম ৷ রামচন্দ্রের আরেক নাম নীলকমল ৷ তাই রাম একটি পদ্ম নিজের চোখ দিয়ে পূরণ করতে যান ৷ কৃত্তিবাসী রামায়ণে রামচন্দ্র বলছেন ,” যুগল নয়ন মোর ফুল্ল নীলোৎপল ৷/ সংকল্প করিব পূর্ণ বুঝিয়ে সকল ৷ একচক্ষু দিব আমি দেবীর চরণে “৷ তখন দেবী দেখা দিয়ে বাধা দেন ৷ রামের পুজো সুসম্পন্ন হয় ৷ দেবী বলেন ,”রাবণে ছাড়িনু আমি , বিনাশ করহ তুমি এত বলি হৈলা অন্তর্ধান “৷ সেই থেকে সন্ধিপূজোয় ১০৮টি কমল বা পদ্ম , ১০৮ প্রদীপ লাগে ৷ পদ্ম হলো ভক্তি এবং প্রদীপ আসলে জ্ঞানের প্রতীক ৷ লাগে লাল ফুল , জবা ফুল , বেলপাতা , শাড়ি বাজে ঢাক , ফোটে আতসবাজী ৷ “স্মৃতিসাগরে” বলা আছে-
“অষ্টম্যাঃ শেষো দণ্ডশ্চ নবম্যাঃ পূর্ব এব চ।
অত্র য ক্রিয়তে পূজা বিজ্ঞেয়া সা মহাফলা। ”
অর্থাৎ- অষ্টমীর শেষ দণ্ড ও নবমী তিথির প্রথম দণ্ডে যে পূজা করা হয় ( সন্ধিপূজা) তাতে মহাফল
লাভ হয় ৷
দেবী এমন উগ্র মূর্তি নিলেন যে অসুর সেনাদের বধ বা ভক্ষন করতে লাগলেন ৷ চন্ডী বলেছে ৷
“যস্মাচ্চণ্ডচ্চ মুণ্ডচ্চ গৃহীত্বা ত্বমুপাগতা।
চামুণ্ডেতি ততো লোকে খ্যাতা দেবি ভবিষ্যসি ।”
অগ্নিপুরাণে আট প্রকার চামুণ্ডার উল্লেখ আছে। যথা- রুদ্রচর্চিকা, রুদ্রচামুণ্ডা, মহালক্ষ্মী, সিদ্ধচামুণ্ডা, সিদ্ধযোগেশ্বরী, রূপবিদ্যা, ক্ষমা ও দন্তুরা । দুর্গা পূজার সময় সন্ধিপূজায় এই দেবী চামুণ্ডার পূজা হয়। কালিকাপুরাণে এই দেবী চামুণ্ডার একটি অন্যরূপ দেখা যায়। নীল পদ্মের মতো শ্যামা , চতুর্ভুজা, ডানদিকের দুই হাতে খটাঙ্গ, চন্দ্রহাস খড়্গ- বামদিকের দুই হাতে পাশ ও ঢাল ধারণ করে আছেন। গলায় মুণ্ডমালা, পরনে বাঘছাল,শীর্ণ ও দীর্ঘকায়া, বড় বড় দাঁত বাইরে , জিহ্বা লকলক করছে । তাঁর ত্রিনয়ন লাল, মুখ ও কর্ণ বড়। দেবী একটি কবন্ধের উপর বিরাজ করছেন। বামন পুরাণ, দেবীভাগবতপুরাণেও চামুণ্ডা দেবীর কথা আছে। অষ্টমী তিথিতে মা দুর্গা রূপে “কুমারী মেয়েদের পুজো” করা হয় ৷ আবার অনেক জায়গায় পালিত হয় “বীরাষ্টমী”ব্রত ৷
“কালী- কালশক্তি । যে চৈতন্যময়ী মহাশক্তি কালবোধে প্রবুদ্ধা হন, তাঁকেই কালীশক্তি বলে। কালাতীত সত্তায় প্রবেশ করতে হলে , সকল সাধককেই এই কালীমূর্তির ভিতর দিয়ে প্রবেশ করিতে হয় । দুই তিথির এই সন্ধিক্ষণে দেবী মহামায়া অম্বিকার কপালের তৃতীয় নেত্র থেকে দেবী কালিকা আবির্ভূত হয়েছিলেন ৷
দংষ্ট্রাকরালবদনে শিরোমালাবিভূষণে ।
চামুণ্ডে মুণ্ডমথনে নারায়ণি নমোহস্তু তে ৷
হিন্দু বিশ্বাস সন্ধি পূজা দর্শনে কাজে সাফল্য আসে , মনের জোর বাড়ে , পরিবারে সুখ ও শান্তি বিরাজ করে ৷ এমনকি আধি -ব্যাধি দূর হপ এবং দেহের সৌন্দর্য বৃদ্ধি পায় ও মনের ইচ্ছা পূরণ হয় ৷


” ওঁ মন্ত্রহীনং ক্রিয়াহীনং তক্তিহীনং সুরেশ্বরী ৷ ঘৎ পূজিতং ময়া দেবী পরিপূর্ণং তদস্থ মে ৷ উ গ্রহীতুং শীর্ব্বদং পূজাং মর্ত্যমন্ডলসংস্থিতাম ৷ চন্ডিকে স্বাং নমাম্যম্ভ স্বয়মধ্যং “৷ এই সন্ধিপূজার সময়ই দেবী মৃন্ময়ী প্রতিমা থেকে চিন্ময়ী রূপে এসে ভক্তের পুজো গ্রহণ করেন ৷ এই সময় উপ-বাস অর্থাৎ দেবী সমীপে বাস করতে হয় ৷ উপবাস বলতে আমরা বুঝি না খেয়ে থাকা তা নয় ৷ তবে , উপোস বা না খেয়ে থাকলে মন সহজে একনিষ্ঠ হয় ৷ সন্ধিপূজার মহেন্দ্রক্ষণে কেউ পশু আবার কেউ চালকুমড়া বা কলা বা আঁখ বা সিঁদুর লাগানো মাসকলাই বলি দেন৷ এগুলো প্রতিকী ৷ নিজের পশুত্বকে বলি দিতে হয় ৷ ” ওঁ মহিষগ্নি মহামায়ে চামুন্ডে মুন্ডমালিনী ৷ আয়ুরারোগ্য বিজয়ং দেহি দেবী নমোস্তুতে ” জয় মা চামুন্ডা ৷ তোমাকে প্রণতি জানাই ,” জয়ন্তী মঙ্গলা কালী ভদ্রকালি কপালিনি ৷ দুর্গা শিবা ক্ষমা ধাত্রী স্বাহা স্বধা নমোস্তুতে “৷
জয় দুর্গতিনাশিনী দুর্গা ৷

More from CultureMore posts in Culture »
More from GeneralMore posts in General »
More from InternationalMore posts in International »
More from SocialMore posts in Social »

Be First to Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *