Press "Enter" to skip to content

শ্যামাপ্রসাদ : এক প্রদীপের নাম…।

ডাঃ দীপালোক বন্দ্যোপাধ্যায়  : কলকাতা।

জন্ম নেয় না প্রতিদিন মানুষ,

কখনও কখনও জন্ম নেয় একটি যুগ,

একটি দীপ্ত উচ্চারণ,

একটি অদম্য প্রশ্ন ?

যে প্রশ্ন ইতিহাসের বুক চিরে

আজও জেগে থাকে,

আজও প্রতিধ্বনিত হয়।

তিনি ছিলেন

বাংলার বাঘ স্যার আশুতোষের উত্তরসূরি,

কিন্তু উত্তরাধিকার ছিল না শুধু রক্তের—

ছিল মেধার দীপ্তি,

সাহসের উজ্জ্বলতা,

আর সত্যের সামনে মাথা নত না করার

অদম্য সংকল্প।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচীন অঙ্গনে

তিনি রবীন্দ্রনাথকে আহ্বান করেছিলেন—

“বাংলা বলুক বাংলার ভাষায়।”

সেদিন সমাবর্তনের মঞ্চে

শুধু ভাষা বদলায়নি,

জেগে উঠেছিল এক জাতির আত্মমর্যাদা।

তিনি জানতেন—

শিক্ষা কেবল পেশা নয়,

শিক্ষা জাতির আত্মা,

বিশ্ববিদ্যালয় কেবল ভবন নয়,

সভ্যতার ভবিষ্যৎ নির্মাণের কর্মশালা।

আর যখন বিদ্রোহী কবি নজরুল

অসুস্থতা, দারিদ্র্য আর নীরবতার অন্ধকারে

ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছিলেন,

তখন রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে

তিনি বাড়িয়ে দিয়েছিলেন

একজন মানুষের হাত।

সেটি ছিল না দয়া,

ছিল শ্রদ্ধার স্পর্শ;

ছিল বাংলা সংস্কৃতির প্রতি

এক রাষ্ট্রনায়কের নীরব অঙ্গীকার।

তাই তো নজরুল লিখেছিলেন—

“এই কোয়ালিশন মন্ত্রিসভায় একমাত্র আপনাকেই

আমি অন্তর থেকে শ্রদ্ধা করি, ভালোবাসি…”

বিদ্রোহী কবির সেই বিশ্বাস

আজও ইতিহাসের পাতায়

মানবিকতার এক উজ্জ্বল স্বাক্ষর।

১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষে

যখন অনাহারে কেঁদেছিল বাংলার মাটি,

তিনি বক্তৃতার চেয়ে বড় করে দেখেছিলেন

রুটির মূল্য, ত্রাণের মূল্য,

মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মূল্য।

দেশভাগের রক্তাক্ত সন্ধ্যায়

তিনি এমন এক সিদ্ধান্তের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন

যা আজও ইতিহাসের বিতর্কের বিষয়।

কিন্তু তাঁর বিশ্বাস ছিল—

বাংলার একটি অংশকে অন্তত

ভারতের ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক মানচিত্রে রক্ষা করতে হবে।

স্বাধীন ভারতের প্রথম শিল্পমন্ত্রী হিসেবে

তিনি শুধু কারখানা গড়েননি,

গড়েছিলেন আত্মনির্ভরতার স্বপ্ন।

চিত্তরঞ্জনের রেল ইঞ্জিন,

সিন্দ্রির সার কারখানা,

বিমান শিল্পের বিস্তার,

ভারী শিল্পের ভিত—

তিনি বুঝেছিলেন,

স্বাধীনতারও একটি অর্থনীতি থাকে।

সংসদের ভেতরে তিনি ছিলেন প্রশ্নের বজ্রকণ্ঠ,

বাইরে ছিলেন কর্মের মানুষ।

মতভেদ ছিল,

কিন্তু দেশ নিয়ে তাঁর উদ্বেগ

কখনও নীরব ছিল না।

কাশ্মীরের পথে তাঁর যাত্রা

ছিল বিশ্বাসের যাত্রা।

তিনি উচ্চারণ করেছিলেন—

“এক দেশে

দুই সংবিধান নয়,

দুই পতাকা নয়,

দুই প্রধানমন্ত্রী নয়।”

এই উচ্চারণে

কেউ শুনেছেন জাতীয় সংহতির আহ্বান,

কেউ দেখেছেন এক রাজনৈতিক দর্শনের প্রকাশ।

ইতিহাস—উভয় স্মৃতিকেই ধারণ করে।

কারাগারের নীরব কক্ষে

অসুস্থ শরীর ধীরে ধীরে নিভে গেল,

কিন্তু নিভল না তাঁর বিশ্বাস।

২৩ জুনের সেই ভোর

আজও রেখে গেছে

অসংখ্য প্রশ্ন,

অসংখ্য অশ্রু,

অসংখ্য উত্তরহীন ইতিহাস।

মা যোগমায়ার আর্তনাদ

আজও বাংলার বাতাসে ভেসে আসে ৷

একজন মায়ের কান্না,

যা দল-মতের সীমা অতিক্রম করে

মানবতার ভাষায় কথা বলে।

তাঁর জীবনকে

শুধু রাজনীতির রঙে দেখো না।

তিনি ছিলেন শিক্ষাবিদ,

সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক,

শিল্পোন্নয়নের স্বপ্নদ্রষ্টা,

মানবিকতার আশ্রয়দাতা,

অসুস্থ নজরুলের সহমর্মী,

আর নিজের বিশ্বাসে অবিচল এক সংগ্রামী বাঙালি।

 

ইতিহাসের মহান মানুষদের

স্লোগানে নয়,

তথ্যে, চিন্তায়, কর্মে

এবং তাঁদের মানবিকতার আলোয়

চেনা উচিত।

কারণ মানুষ চলে যায়,

কিন্তু আদর্শ থেকে যায়।

প্রদীপ নিভে যায়,

কিন্তু তার আলো

প্রজন্মের পর প্রজন্ম

অন্ধকার ভেদ করে পথ দেখায়।

আজ তাঁর ১২৫তম জন্মজয়ন্তীতে

আমাদের অতল শ্রদ্ধা

শুধু এক রাজনৈতিক নেতার প্রতি নয়—

একজন শিক্ষাবিদ,

একজন রাষ্ট্রচিন্তক,

একজন শিল্পনির্মাতা,

একজন সংস্কৃতিপ্রেমী,

একজন মানবিক সহযাত্রীর প্রতি।

শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি—

একটি নাম নয়,

একটি জাগরণ।

একটি প্রদীপ নয় শুধু,

একটি অনির্বাণ শিখা—

যার আলোয় ইতিহাস আজও

নিজেকে নতুন করে পড়ে।

 

More from CultureMore posts in Culture »

Be First to Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *