চন্দন রুদ্র : কলকাতা, ১৬ আগস্ট, ২০২৬। ১৯৮০ সালের ১৬ অগষ্ট। আজকের দিনেই কলকাতার ইডেন গার্ডেন্সে দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইস্টবেঙ্গল আর মোহনবাগানের ডার্বি ম্যাচকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া অশান্তির জেরে ঝরে গিয়েছিল ১৬টি তরতাজা প্রাণ। কলকাতা ফুটবলের সেই মর্মান্তিক ঘটনা বাংলা তথা ভারতীয় ফুটবলের এক কলঙ্কিত অধ্যায়।
আজ থেকে ৪৩ বছর আগে ঠিক কী ঘটেছিল সেদিন? ইডেন গার্ডেন্সে লিগ ফুটবলে মুখোমুখি হয়েছিল শহরের দুই শক্তিধর দল। ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধের ১০-১২ মিনিটের মাথায় ইস্টবেঙ্গল দলের রক্ষণভাগের ফুটবলার দিলীপ পালিত মোহনবাগানের গতিসম্পন্ন ফুটবলার, বর্তমানে বিধায়ক বিদেশ বসুকে কড়া ট্যাকেল করে বসেন। বিদেশ মাটিতে পড়ে যান।
কিন্তু এর ঠিক পরেই বিদেশ চকিতে মাটি থেকে উঠেই মাথা গরম করে দিলীপকে সজোরে লাথি মেরে বসেন। এখান থেকেই মাঠে উত্তেজনার সূত্রপাত! হাই ভোল্টেজ ম্যাচটি সামলাতে গিয়ে ওই অবস্থায় রেফারি প্রয়াত সুদিন চট্টোপাধ্যায় দু’জনকেই লাল কার্ড দেখিয়ে মাঠের বাইরে বের করে দেন।
কিন্তু মাঠের সেই উত্তেজনার আঁচ ক্রমশ ছড়িয়ে পরতে শুরু করে ইডেনের গ্যালারিতে। বিশেষ করে তখনকার রঞ্জি স্ট্যান্ডে পাশাপাশি বসে থাকা দুই দলের সমর্থকরা একেবারে তুমুল সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। তাঁদের হাতাহাতি, মারামারিতে উত্তেজনা ক্রমশ বাড়তেই থাকে।
একটা সময় সেই উত্তেজনা চরম আকার নেয়। পুলিশের লাঠি চার্জে সেই উত্তেজনায় যেন ঘৃতাহুতি পড়ে। ইডেনের সঙ্কীর্ণ গেট দিয়ে বেরোতে গিয়ে দর্শকদের মধ্যে শুরু হয়ে যায় ধাক্কাধাক্কি, হুড়োহুড়ি, ছোটাছুটি। ভিড়ের চাপে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন অসংখ্য দর্শক। অনেকে তাঁদের মাড়িয়েই চলে যান। এই বিশৃঙ্খলার পরিণতিতে কী হল? ইডেনের সেই অভিশপ্ত ম্যাচ কেড়ে নিল ১৬টি তাজা প্রাণ। রক্তাক্ত হয়ে গেল সবুজ ইডেন।
সন্তান প্রসবকালে স্ত্রী বিয়োগ ঘটেছিল উত্তর কলকাতার সিমলা রোডের বাসিন্দা অলোক দাসের। স্ত্রী রীতার মৃত্যুশোকে ভেঙে পড়েছিলেন তিনি। বন্ধুর অনুরোধে প্রিয় স্ত্রীকে হারানোর শোক কিছু সময়ের জন্য ভুলে থাকতে সেদিন মাঠে গিয়েছিলেন অলোক। ২৮ দিনের কন্যা সন্তানকে বাড়িতে রেখে গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু দুর্ভাগ্য, মাঠ থেকে প্রাণ নিয়ে আর বাড়ি ফিরতে পারেননি আলোক।
মাঠ থেকে সেদিন আর ঘরে ফেরেননি নারকেলডাঙার ফুটবল পাগল যুবক উত্তম ছাউলে, কার্তিক মাইতি,সবে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দেওয়া ছটফটে তরুণ রাসবিহারী অ্যাভিনিউয়ের অসীম চট্টোপাধ্যায়রা।
ষোলোটি তাজা প্রাণ। কিন্তু বিধানসভা ভবনের দিকে ইডেন গার্ডেন্সের পাঁচিলে ১৬টি নামের স্মৃতি ফলক আর প্রতি বছর ১৬ অগষ্ট আইএফএ-র রক্তদান শিবির ছাড়া ওঁদের আর মনে রাখেনি কেউ!
কিন্তু আজও সেই দুঃখের স্মৃতি বহন করে চলেছে প্রিয় দলের খেলা দেখতে এসে প্রয়াত ১৬ জন ফুটবল পাগল তরুণের ভাগ্যহীন পরিবারগুলো। সত্যি, কলকাতা তথা ভারতীয় ফুটবলের এ এক বড় ট্র্যাজেডি।










Be First to Comment