কঙ্ক ঘোষ দস্তিদার : কলকাতা, ৩০ জুলাই, ২০২৬।লোকসভা থেকে সাসপেন্ড হওয়ার পরই তৃণমূল কংগ্রেসের শ্রীরামপুরের সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় স্পষ্ট জানিয়ে দেন, সংসদের অধিবেশন যতদিন চলবে, ততদিন তিনি প্রতিদিন সংসদ চত্বরে এসে নিজের প্রতিবাদ জানাবেন। বৃহস্পতিবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। তবে এদিনের বিক্ষোভ ছিল কিছুটা আলাদা। একদিকে যেমন তিনি একাই প্রতিবাদে সামিল হলেন, তেমনই নিজের বিক্ষোভে যোগ করলেন নতুন মাত্রা। আর বিক্ষোভের মাঝেই কংগ্রেস সাংসদ প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর সঙ্গে সংক্ষিপ্ত কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ কথোপকথন !
সম্প্রতি সংসদের ভিতরে কুকথা বলা, অন্য সাংসদদের অপমান করা এবং নারীবিদ্বেষী মন্তব্য করার অভিযোগে লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে সাসপেন্ড করেন। সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধেই তিনি ধারাবাহিকভাবে তাঁর প্রতিবাদ। বৃহস্পতিবারও সকাল থেকেই সংসদ ভবনের মকর দ্বারের সামনে তিনি একা।
তবে এদিন তাঁর হাতে শুধু প্ল্যাকার্ড ছিল না। ছিল একটি বড় ব্যানার, যাতে ছবি-সহ স্থান পেয়েছিলেন এনসিপিআই-এর ২০ জন সাংসদ। কল্যাণের অভিযোগ, এই সাংসদরাই তৃণমূল ছেড়ে অন্য শিবিরে গিয়েছেন এবং তাঁদের ভূমিকা বিশ্বাসঘাতকতার সামিল। তাই তাঁদের ছবি-সহ ব্যানার হাতে নিয়ে তিনি সংসদের প্রবেশপথে দাঁড়িয়ে বিক্ষোভ দেখান। কখনও সংসদের গেটের সামনে, কখনও সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে জোর গলায় স্লোগান তুলতে থাকেন। তাঁর কণ্ঠে বারবার শোনা যায়, “মোদি কে সাথ ২০ গদ্দার।” সেই স্লোগানে যেমন ছিল রাজনৈতিক ক্ষোভ, তেমনই ছিল দলত্যাগীদের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণের বার্তা।
ঠিক এই সময়ই সংসদ ভবন থেকে বেরিয়ে আসছিলেন কংগ্রেস সাংসদ প্রিয়াঙ্কা গান্ধী। তাঁর সঙ্গে ছিলেন আরও কয়েকজন কংগ্রেস সাংসদ। প্রিয়াঙ্কাকে চোখে পড়তেই কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “প্রিয়াঙ্কা জি, সদন মে মোদি কে সাথ ২০ গদ্দার হ্যায় !”
কল্যাণের কথা শুনে প্রিয়াঙ্কা গান্ধী থেমে যান। স্বভাবসুলভ হাসিমুখে তাঁর দিকে এগিয়ে এসে তিনি জবাব দেন, “দাদা, এরা তো একসময় কংগ্রেসেই ছিলেন। পরে আপনাদের দলে গিয়েছিলেন। এবার আপনাদেরও ধোঁকা দিল।”
প্রিয়াঙ্কার এই মন্তব্যে কথোপকথনের মোড় ঘুরে যায়। কংগ্রেসের প্রসঙ্গ উঠতেই কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় কিছুটা উত্তেজিত হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, “কংগ্রেসে ছিলেন মানে কী? আমরাও তো কংগ্রেসে ছিলাম। প্রণবদারা সিপিএমের বি টিমের মতো কাজ না করলে দিদিকে বেরিয়ে আসতে হত না।” তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে অতীতের রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়ে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ এবং তৃণমূলের জন্মপর্বের স্মৃতি।
তবে কল্যাণের গলায় রাগ থাকলেও প্রিয়াঙ্কা গান্ধী নিজের স্বভাবসিদ্ধ শান্ত ভাব বজায় রাখেন। হাসিমুখেই তিনি পাল্টা বলেন, “কিন্তু রাজীবজির সঙ্গে দিদির সম্পর্ক তো খুব ভালো ছিল।”
এই মন্তব্যে কল্যাণ আরও ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। সঙ্গে সঙ্গেই তিনি জবাব দেন, “সেই সম্পর্ক আপনারাই রাখতে পারেননি।” মুহূর্তের জন্য সংসদ চত্বরে রাজনৈতিক ইতিহাস, ব্যক্তিগত সম্পর্ক এবং বর্তমান রাজনৈতিক সমীকরণ সবকিছুই যেন একসঙ্গে উঠে আসে এই সংলাপে।
এই কথোপকথনের মাঝেই কংগ্রেস সমর্থিত নির্দল সাংসদ পাপ্পু যাদবও কিছু বলতে এগিয়ে আসেন। কিন্তু তাঁকে কথা শেষ করার সুযোগ দেননি কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। মাঝপথেই তাঁকে থামিয়ে দেন তিনি। যদিও পরিস্থিতি আর উত্তপ্ত হয়নি। কয়েক মুহূর্তের এই রাজনৈতিক বাক্যবিনিময়ের পর সকলেই নিজেদের পথে চলে যান এবং বিতর্কও সেখানেই থেমে যায়।
কল্যাণের একক প্রতিবাদ এবং প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর সঙ্গে তাৎপর্যপূর্ণ সংক্ষিপ্ত কথোপকথন, সংসদ চত্বরে, আজকের রাজনৈতিক নাটকের অন্যতম আকর্ষণ। ভবিষ্যৎ বলবে, আদৌ এর কোন প্রভাব রাজনীতিতে পড়ল কিনা। আপনাদের কি মনে হয় ::




Be First to Comment