ডাঃ দীপালোক বন্দ্যোপাধ্যায় : এলাহাবাদ, ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬। আমাদের সনাতন হিন্দু ধর্মে “গঙ্গার মত পবিত্র নদীতে স্নান বিশেষ করে প্রয়াগ রাজের মত ত্রিবেণী সঙ্গমে স্নানকে ” খুব পুণ্যকর্ম মনে করা হয় ৷ কুম্ভমেলার বিশেষ সময়ে ইচ্ছা সত্ত্বেও যেতে পারি নি ৷ আজ আমার সেই অপূর্ণ ইচ্ছা ঈশ্বরের কৃপায় পূর্ণ হওয়ায়
খুব ভালো লাগছে ৷ কিন্তু , গঙ্গা-যমুনা ও অন্তঃসলিলা
সরস্বতীর মিলন স্থলে গিয়ে খুব খারাপ লাগছিল ৷ নৌকা করে স্নান নিয়ে যাওয়া থেকে সবক্ষেত্রে হয়রানি
এবং খুব বেশি টাকার দাবী মেনে নিতে পারছিলাম না ৷
ঘাট থেকে সঙ্গম পৌঁছে স্নান সেরে ফেরার পাঁচ জনের নৌকা ভাড়া কেউ বারো হাজার আবার কেউ আট হাজার চাইতে থাকে ৷ আধ ঘন্টার জন্য এত টাকার দাবী শুনে আমরা ভেবেছিলাম স্নান না করে মাথায় জল ঠেকিয়ে ফিরে যাবো ৷ যাইহোক পরে এক হাজার টাকায় রফা করে স্নান সারলাম ৷ এরপরেও স্নানের জায়গায় প্ল্যাটফর্মের চার্জ সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে টাকা লাগল ৷ ভারত সরকার ও উত্তরপ্রদেশ সরকার এবং প্রয়াগরাজ পৌরসভার প্রতি আমার বিনীত আবেদন ধর্মের নামে এরকম বেসাতি বন্ধ করার ব্যবস্থা হোক ৷ সাধারণ পূণ্যার্থীদের কথা ভেবে এদিকে দৃষ্টি দিয়ে রেট চার্ট অবিলম্বে বেঁধে দেওয়া হোক ৷ এবার আসি সনাতন হিন্দু ধর্মে স্নান মাহাত্ম্যের বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থেদেওয়া ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে ৷
শাস্ত্রে গঙ্গা স্নানের মাহাত্ম্য
হিন্দু শাস্ত্র, বিশেষ করে পুরাণগুলোতে গঙ্গা স্নানের মাহাত্ম্যের বিস্তৃত বর্ণনা পাওয়া যায়। বৃহন্নারদীয় পুরাণ-এ গঙ্গাকে সমস্ত নদীর মধ্যে শ্রেষ্ঠ বলে ঘোষণা করা হয়েছে এবং তাকে “পাপকাননের দাবাগ্নি” অর্থাৎ পাপরূপী বনদস্যুদের জন্য দাবানলের সাথে তুলনা করা হয়েছে। শাস্ত্রে বলা হয়েছে, গঙ্গার মতো শান্তিদায়িনী আর কিছুই নেই ।
গঙ্গা ও গায়ত্রীকে একত্রে সর্বপাপহারিণী বলে মনে করা হয়। বৃহন্নারদীয় পুরাণ-এ উল্লেখ আছে, গায়ত্রী যেমন বেদের জননী, গঙ্গাও তেমনি এই বিশ্বের জননী। যিনি গায়ত্রীর প্রতি ভক্ত, গঙ্গাও তার প্রতি প্রসন্ন হন। এই সূত্রে গঙ্গা স্নানকে কেবল বাহ্যিক শুদ্ধি নয়, আত্মিক জ্ঞান ও মুক্তির পথ প্রস্তুতকারী একটি আচার হিসেবে দেখা হয় ।
বিভিন্ন পুরাণে গঙ্গা স্নানের ফলকে অমূল্য বলে বর্ণনা করা হয়েছে।
বৃহন্নারদীয় পুরাণে বর্ণিত আছে, “নাস্তি মোক্ষাৎ পরো লাভো নাস্তিগঙ্গাসমা নদী” অর্থাৎ মোক্ষ লাভের মতো পরম লাভ আর কিছুই নেই এবং গঙ্গার সমতুল্য পবিত্র নদীও আর কিছুই নেই ।
পবিত্র নদীতে অবগাহনের ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক তাৎপর্য
গঙ্গাস্নানের মাহাত্ম্য বহুমাত্রিক। এর ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক তাৎপর্য নিম্নরূপ:
পাপ মোচন: হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী, পবিত্র গঙ্গায় স্নান করলে জীবনের সমস্ত পাপ ও দুঃখ-কষ্ট থেকে মুক্তি পাওয়া যায় । বিশেষ করে গঙ্গা দশেরা বা দশহরা তিথিতে গঙ্গাস্নানের মাধ্যমে দশ প্রকার পাপ (শারীরিক, বাচনিক ও মানসিক) থেকে মুক্তি লাভ করা যায় বলে প্রচলিত বিশ্বাস । এই দশ পাপের মধ্যে রয়েছে পরস্ত্রীগমন, হিংসা, মিথ্যা বলা, পরনিন্দা, কুভাষণ ইত্যাদি ।
পুণ্য লাভ ও মুক্তিলাভ: মকর সংক্রান্তি, কুম্ভ ইত্যাদি বিশেষ তিথিতে গঙ্গাস্নানের গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে যায়। এই সময় গঙ্গায় স্নান করলে অশ্বমেধ যজ্ঞের ফল লাভ হয় এবং মুক্তি লাভ করা সম্ভব বলে মনে করা হয় । ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ অনুসারে, জ্যৈষ্ঠ মাসের শুক্লপক্ষের দশমী তিথিতে (দশহরা) গঙ্গাস্নান করলে দশ জন্মের পাপ বিনষ্ট হয় ।
পিতৃপুরুষের তৃপ্তি ও মুক্তি: গঙ্গাস্নানের পাশাপাশি গঙ্গাতীরে পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে তর্পণ ও পিণ্ডদানের বিশেষ মাহাত্ম্য রয়েছে। এর মাধ্যমে পিতৃগণ শতবর্ষ পর্যন্ত তৃপ্তি লাভ করেন এবং তাঁদের আত্মা শান্তি পায় । এমনকি কোনো পাপী ব্যক্তি যদি গঙ্গার উদ্দেশ্যে যাত্রা করার পথেই মৃত্যুবরণ করেন, তবুও তিনি বিষ্ণুলোকে গমন করেন বলে শাস্ত্রের উক্তি ।
ঐশ্বরিক ও বৈজ্ঞানিক তাৎপর্য: পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে, রাজা ভগীরথের তপস্যায় তুষ্ট হয়ে দেবী গঙ্গা স্বর্গ থেকে মর্ত্যে অবতরণ করেন তার পূর্বপুরুষদের মুক্তি দিতে। দু একশো বছর আগেও একধরণের কর্লিফর্ম ব্যাক্টেরিয়ার জন্য গঙ্গার ছিল ক্ষতিকর জীবাণু মুক্ত ও সুপেয় ৷ অন্যদিকে, গঙ্গায় তামার মুদ্রা নিক্ষেপের রীতির একটি বৈজ্ঞানিক ভিত্তিও রয়েছে। প্রাচীনকালে তামার জীবাণুনাশক গুণের জন্য এবং তামার উপাদান মানবদেহের জন্য উপকারী হওয়ায় এই প্রথা চালু হয়েছিল বলে মনে করা হয় ।
বিশেষ তিথিতে গঙ্গাস্নান
বিভিন্ন তিথি, নক্ষত্র ও গ্রহণের যোগে গঙ্গাস্নানের ফল অনেক গুণ বেড়ে যায়।
তিথি/যোগের নাম সময় ফল/মাহাত্ম্য
গঙ্গা দশেরা / দশহরা জ্যৈষ্ঠ মাসের শুক্লপক্ষের দশমী দশ প্রকার পাপ বিনাশ, মুক্তিলাভ
মকর সংক্রান্তি সাধারণতঃ ১৪ই জানুয়ারি সমস্ত পাপ নাশ, পূর্বপুরুষের আত্মার শান্তি
বারুণী স্নান চৈত্র মাসের কৃষ্ণা ত্রয়োদশী ও শতভিষা নক্ষত্রের যোগ শতাধিক সূর্যগ্রহণের সমান ফল
গ্রহণ স্নান সূর্য বা চন্দ্রগ্রহণের সময় লক্ষ থেকে কোটি গুণ ফল লাভ
নির্জলা একাদশী জ্যৈষ্ঠ মাসের শুক্লপক্ষের একাদশী ভগবান বিষ্ণুর আশীর্বাদ, উপবাস পালন
গঙ্গাস্নানের নিয়ম ও পদ্ধতি
গঙ্গাস্নানের পূর্ণ ফল লাভের জন্য কিছু নিয়ম ও পদ্ধতি অনুসরণ করা জরুরি। নিয়ম না মেনে করলে স্নান ফলপ্রসূ নাও হতে পারে:
ধ্যান ও স্তব: স্নানের পূর্বে দেবী গঙ্গার ধ্যান করা এবং তাঁর স্তব পাঠ করা উচিত। স্নানের সময় “ওম নমো ভগবতী হিলি হিলি মিলি মিলি গঙ্গে মা পাভয় পাভয়ে স্বাহা” ” ওম গঙ্গাদেবীনমঃ “এইরকম মন্ত্র জপ করলে সমস্ত পাপ নষ্ট হয় বলে বিশ্বাস । এছাড়া, “রোগং শোকং তাপং পাপং হর মে ভগবতি কুমতিকলাপম্। ত্রিভুবনসারে বসুধাহারে ত্বমসি গতির্মম খলু সংসারে।।” এই মন্ত্র উচ্চারণ করাও বিধেয় ।
শুদ্ধাচার: গঙ্গাস্নানের আগে সাধারণ জলে স্নান করে নেওয়া উচিত। গঙ্গার জলে গা ঘষে স্নান না করে একবার ডুব দিয়ে ওঠাই বিধেয় । এছাড়া, রজস্বলা অবস্থায় মহিলাদের গঙ্গাস্নান করা উচিত নয়। এই সময় গঙ্গার জল সংগ্রহ করে বাড়িতে স্নান করতে পারেন ।
সম্মান ও শুদ্ধতা: গঙ্গাজল কখনো আগুনে গরম করা উচিত নয়। প্রয়োজনে শুধুমাত্র সূর্যের তাপে গরম করা যেতে পারে । গঙ্গাস্নানের পর বাড়িতে গিয়ে পুনরায় স্নান করা উচিত নয়, এতে মা গঙ্গার অপমান হয় বলে মনে করা হয় ।
দান ও পুজো : স্নানের পর দান করার বিশেষ বিধান রয়েছে। গঙ্গা দশমীর তিথিতে দশটি বস্তু (যেমন জল, অন্ন, ফল, বস্ত্র ইত্যাদি) দান করা এবং দশজন ব্রাহ্মণকে দক্ষিণা দেওয়া শুভ বলে মনে করা হয় । এছাড়া, গঙ্গার ঘাটে শিবলিঙ্গে গঙ্গাজল দিয়ে অভিষেক করলে নেতিবাচক শক্তি দূর হয় ।
গঙ্গাস্নানের প্রধান তীর্থস্থান
গঙ্গার বিভিন্ন তীর্থস্থানে স্নানের মাহাত্ম্য ভিন্ন ভিন্ন। দেশের চারটি প্রধান গঙ্গা স্নানের তীর্থস্থান হল:
· গঙ্গাসাগর (পশ্চিমবঙ্গ): যেখানে গঙ্গা বঙ্গোপসাগরে মিশেছে। এই সঙ্গমে স্নান করলে দশটি অশ্বমেধ যজ্ঞ ও হাজার গাভী দানের সমান পুণ্য লাভ হয় বলে বিশ্বাস ।
· হরিদ্বার (উত্তরাখন্ড): যেখানে গঙ্গা প্রথম সমতলে এসে পৌঁছায়। এখানে স্নান করলে সমস্ত পাপ থেকে মুক্তি পাওয়া যায় ।
· বারণসী / কাশী (উত্তরপ্রদেশ): মোক্ষদায়িনী শহর হিসেবে পরিচিত কাশীর ঘাটে গঙ্গাস্নান করলে মোক্তি লাভ হয় বলে বিশ্বাস ।
· ত্রিবেণী সঙ্গম, প্রয়াগরাজ (উত্তরপ্রদেশ): গঙ্গা, যমুনা ও সরস্বতীর পবিত্র সঙ্গমে স্নান করলে সমস্ত কষ্ট দূর হয় এবং পুণ্য লাভ হয়। কুম্ভ ও মাঘ মেলার সময় এই সঙ্গমে স্নানের গুরুত্ব অপরিসীম ।
পরিশেষে বলা যায়, হিন্দু ঐতিহ্যে গঙ্গাস্নান কেবল একটি ধর্মীয় আচারানুষ্ঠান নয়, বরং এটি আত্মশুদ্ধি, পাপমোচন, পিতৃঋণ পরিশোধ ও পরম মুক্তি লাভের একটি বিশ্বাস ও সাধনা। শাস্ত্রের নির্দেশনা, পৌরাণিক কাহিনি ও লোকবিশ্বাসের সমন্বয়ে গঙ্গাস্নানের এই মাহাত্ম্য আজও লক্ষ লক্ষ ধর্মবিশ্বাসীর হৃদয়ে অটুট রয়েছে এবং আগামী প্রজন্মের কাছেও এটি এক অবিচ্ছেদ্য ৷ সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হবে।
প্রয়াগের ত্রিবেণী সঙ্গমকে হিন্দু শাস্ত্রে “তীর্থরাজ” বা সমস্ত তীর্থস্থানের রাজা হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে । গঙ্গা, যমুনা এবং অধরা সরস্বতীর এই পবিত্র মিলনস্থলকে কেন্দ্র করে হিন্দু ধর্মগ্রন্থগুলিতে পুণ্যস্নানের যে অপরিসীম মাহাত্ম্য বর্ণিত হয়েছে, তা নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
শাস্ত্রীয় ভিত্তি ও পৌরাণিক প্রেক্ষাপট
ত্রিবেণী সঙ্গমের উল্লেখ এবং এর মাহাত্ম্যের বর্ণনা বেদ, পুরাণ সহ বহু প্রাচীন ধর্মগ্রন্থে পাওয়া যায়।
· বৈদিক উল্লেখ: ঋগ্বেদে যে স্থানে দুই নদীর মিলন হয়, সেই সঙ্গমে স্নানের পুণ্যের কথা বলা হয়েছে। একটি আধুনিক ব্যাখ্যা অনুসারে, ঋগ্বেদে উল্লেখ আছে, “যারা সেই স্থানে স্নান করে, যেখানে সাদা ও কালো দুই নদী একসাথে প্রবাহিত হয়, তারা স্বর্গারোহণ করে” । এই সাদা ও কালো নদী বলতে সম্ভবত গঙ্গা ও যমুনাকেই বোঝানো হয়েছে।
· পুরাণের বর্ণনা: স্কন্দপুরাণ, পদ্মপুরাণ, মৎস্যপুরাণ-সহ একাধিক পুরাণে ত্রিবেণী সঙ্গমে স্নানের ফলাফলকে অশ্বমেধ ও রাজসূয় যজ্ঞের ফলাফলের সমতুল্য বলে বর্ণনা করা হয়েছে ।
· পদ্মপুরাণ অনুসারে, প্রয়াগরাজ তীর্থস্থানের মধ্যে শ্রেষ্ঠ।
ব্রহ্মপুরাণে উল্লেখ আছে, মাঘ মাসে গঙ্গা-যমুনার সঙ্গমে বা তার তীরে স্নান করলে অগণিত অশ্বমেধ যজ্ঞের ফল লাভ হয় ।
পৌরাণিক কাহিনি:
· ব্রহ্মার যজ্ঞ: সৃষ্টির আদিতে স্বয়ং ব্রহ্মা এই পবিত্র ভূমিতে “প্রকৃষ্ট যজ্ঞ” (শ্রেষ্ঠ যজ্ঞ) সম্পন্ন করেছিলেন। এই কারণেই প্রয়াগের প্রাচীন নাম “প্রয়াগ” (প্র+যজ্ঞ) হয়েছে বলে মনে করা হয় ।
· অমৃতের সন্ধান: সমুদ্রমন্থনের সময় দেবতা ও অসুরদের মধ্যে অমৃত নিয়ে দ্বন্দ্ব চলাকালে যে চার স্থানে অমৃতের ফোঁটা পড়েছিল, প্রয়াগ তার মধ্যে একটি। এই কারণে কুম্ভের সময় এখানে স্নানের মাহাত্ম্য অসামান্য হয়ে ওঠে, কারণ বিশ্বাস করা হয় সেই পুণ্যলগ্নে অমৃতের উপস্থিতি ত্রিবেণীর জলে বিরাজ করে ।
পুণ্যস্নানের আধ্যাত্মিক তাৎপর্য ও ফল
ত্রিবেণী সঙ্গমে স্নানকে শুধু একটি শারীরিক ক্রিয়া নয়, বরং আত্মার মুক্তির পথ হিসেবে দেখা হয়।
· সকল পাপ বিনাশ ও মোক্ষ লাভ: এখানে স্নান করলে জীবনের সমস্ত পাপ ধুয়ে যায় এবং জন্ম-মৃত্যুর চক্র থেকে মুক্তি অর্থাৎ মোক্ষ লাভ করা যায় বলে শাস্ত্রের নির্দেশ ।
· পিতৃপুরুষের তৃপ্তি: এখানে পিণ্ডদান ও তর্পণের বিশেষ মাহাত্ম্য রয়েছে। হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী, ত্রিবেণীতে এই অনুষ্ঠান করলে পিতৃপুরুষগণ পরম তৃপ্তি লাভ করেন এবং তাদের আত্মা শান্তি পায় ।
· তীর্থরাজের মাহাত্ম্য: প্রয়াগকে সমস্ত তীর্থের রাজা বলা হয়েছে। তাই একটি তীর্থে স্নানের পুণ্য যেমন, ত্রিবেণীতে স্নান করলে সকল তীর্থে স্নানের সমান পুণ্য অর্জিত হয় বলে মনে করা হয় ।
বিশেষ তিথি ও মেলায় স্নানের ফল
সাধারণ দিনের তুলনায় বিশেষ তিথি ও পর্বে ত্রিবেণী সঙ্গমে স্নানের ফল বহুগুণ বেড়ে যায়।
তিথি/মেলার নাম সময় ফল/মাহাত্ম্য
কুম্ভ মেলা প্রতি ১২ বছরে একবার এই সময় জলে অমৃতের উপস্থিতি থাকে বলে বিশ্বাস। লক্ষ লক্ষ পুণ্যার্থী শাহী স্নানে অংশ নেয় ।
অর্ধ কুম্ভ মেলা প্রতি ৬ বছরে একবার কুম্ভ মেলার সমান গুরুত্বপূর্ণ, বিপুল সংখ্যক সন্ন্যাসী ও ভক্তের সমাগম হয়।
মাঘ মেলা প্রতি বছর (জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি) মাঘ মাসে স্নান অত্যন্ত শুভ। বহু ভক্ত কল্পবাস করে এবং প্রতিদিন স্নান করেন ।
মকর সংক্রান্তি ও অমাবস্যা নির্দিষ্ট তিথি অনুযায়ী এই দিনগুলিতে সঙ্গমে স্নান অত্যন্ত ফলপ্রসূ বলে গণ্য করা হয়। হাজার হাজার ভক্ত স্নানার্থে সমবেত হন ।
বৈশিষ্ট্য ও আচার-অনুষ্ঠান
· নদীর রূপ: সঙ্গমস্থলে গঙ্গা ও যমুনার জল পরিষ্কারভাবে আলাদা করা যায়। গঙ্গার জল অপেক্ষাকৃত স্বচ্ছ ও বালুকাময়, আর যমুনার জল গভীর ও সবুজাভ আভাযুক্ত। এই দৃশ্য অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক ।
· স্নানের পদ্ধতি: পুণ্যার্থীরা নৌকা করে সঙ্গমের মূল স্রোতে (সঙ্গম নাক) গিয়ে স্নান করেন। স্নানের সময় মন্ত্রোচ্চারণ ও ধ্যান করার বিধান রয়েছে ।
· গঙ্গা আরতি: প্রতিদিন সন্ধ্যায় সরস্বতী ঘাটে জাঁকজমকপূর্ণ গঙ্গা আরতি অনুষ্ঠিত হয়, যা উপস্থিত সবার মনে ভক্তি ও পুলক জাগায় ।
একজন ধর্মপ্রাণ মানুষ হিসাবে , হিন্দু শাস্ত্রে প্রয়াগের ত্রিবেণী সঙ্গমকে শুধু একটি ভৌগোলিক সঙ্গমস্থল নয়, বরং স্বর্গ ও মর্ত্যের মিলনস্থল, মোক্ষলাভের একটি প্রধান দ্বার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বেদ-পুরাণের বাণী থেকে শুরু করে আজও লক্ষ লক্ষ মানুষের অটুট বিশ্বাস, ত্রিবেণীর পুণ্যস্নানকে হিন্দুধর্মের জীবন্ত ও শাশ্বত এক চেতনায় পরিণত করেছে। যা বংশ পরম্পরায় আমাদের মধ্যে বিদ্যমান ৷ জয় মা গঙ্গা –
যমুনা -সরস্বতী ৷ জয় প্রয়াগ রাজ ৷









Be First to Comment