Press "Enter" to skip to content

সুকুমার রায় রবীন্দ্রনাথের অনেক গান/কবিতা ইংরেজিতে অনুবাদ করেছিলেন— যা ইংল্যান্ডের গুণীমহলে সমাদৃত হয়েছিল….।

স্মরণঃ সু কু মা র রা য়

বাবলু ভট্টাচার্য : মাত্র ছত্রিশ বছর জীবনে তিনি আমাদের শিশু সাহিত্যে এমন অবিস্মরণীয় অবদান সৃষ্টি করে গেছেন যে, তার স্বাদ চিরনতুন বলে অনুভব করি।

প্রথম কবিতা ‘মুকুল’ পত্রিকায় প্রকাশ মাত্র ন’বছর বয়সে— নাম ‘নদী’। তারপর ১৩১৩-তে প্রথম গদ্য ‘মুকুলে’, নাম— ‘সূর্যের রাজা’। প্রবাসীতে ১৩১৭ সালে প্রবন্ধ— ‘ভারতীয় চিত্রশিল্প’। ১৯০৮-০৯ সালে তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘ননসেন্স ক্লাবে’র জন্য নাটক রচনা করলেন ‘ঝালাপালা’ ও ‘লক্ষ্মণের শক্তিশেল’।

প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন ১৯০২ সালে, এ সময়ে তিনি ব্রাহ্মসমাজের Student Weekly Service-এর সঙ্গে যুক্ত হন। এ সময়ে তার সঙ্গে অনেক উৎসাহী সমমনোভাবাপন্ন বন্ধুদের যোগাযোগ ঘটে। ১৯০৬ সালে তিনি পদার্থবিদ্যা ও রসায়ন শাস্ত্রে অনার্স নিয়ে বিএসসি পাস করলেন। এরপরই তার ‘ননসেন্স ক্লাবে’র কাজকর্ম শুরু হল।

১৯১১ সালে সুকুমার রায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘গুরুপ্রসন্ন ঘোষ বৃত্তি’ লাভ করে লন্ডনে গেলেন ‘চিত্র-মুদ্রণ বিদ্যা’ শেখার জন্য। সুকুমারের ফটোগ্রাফ ও অঙ্কনে ছোটবেলা থেকেই ঝোঁক ছিল, ব্রিটেনের ‘Boys own Paper’ পত্রিকায় ফোটোগ্রাফির এক আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় তিনি তৃতীয় স্থান লাভ করেন মাত্র সতেরো বছর বয়সে।

সুকুমার রায়ের জীবনে কবিগুরুর প্রভাব অনেকখানি। যখন রবীন্দ্রনাথ লন্ডনে গেলেন সুকুমার উচ্চশিক্ষার জন্য সেখানে, তার আবাসস্থল থেকে কবির বাসস্থান খুব কাছেই। এখানেই কবির সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ক্রমশ অন্তরঙ্গতায় পরিণত হল।

সুকুমার রায় এই যোগাযোগের বিবরণ বিস্তারিতভাবে তাঁর মা-বাবা ও ঘনিষ্ঠদের চিঠি লিখে নিয়মিতভাবে জানাতেন। তিনি রবীন্দ্রনাথের অনেক গান/কবিতা ইংরেজিতে অনুবাদ করেছিলেন— যা ইংল্যান্ডের গুণীমহলে সমাদৃত হয়েছিল। সেইসঙ্গে কবিও সন্তোষ লাভ করেছিলেন।

উচ্চশিক্ষা থেকে ফিরে সুকুমার রীতিমত শিশু সাহিত্য রচনার কাজে হাত দিলেন। পিতার মৃত্যুর পর ‘সন্দেশ’ পত্রিকার সমস্ত ভার তাঁর উপর এসে পড়ল। সত্যিই আমৃত্যু তিনি ‘সন্দেশ’ পত্রিকার শ্রীবৃদ্ধি উত্তরোত্তর বৃদ্ধি করে গিয়েছিলেন।

তারপর একে একে যেন দৃশ্যান্তর পর্ব চলতে লাগল— ‘গোঁফচুরি, ‘কাঠবুড়ো’, ‘সৎপাত্র’, ‘গানের গুঁতো’, ‘কুমড়ো পটাশ’ নতুন নতুন রস অসম্ভবকে সবার সামনে ছন্দে ভাষায় ও ছবিতে এনে ফেলা। তাঁর প্রতিটি ছড়ার সঙ্গে তাঁর স্বহস্তে অসাধারণ অঙ্কনচিত্র কল্পনাকে বাস্তবে রূপ দিতে সহায়তা করেছে।

সুকুমার রায়ের নাটকের সংখ্যা আটটি। যা সদস্যরা সকলে মিলে অভিনয় করতেন। ‘ঝালাপালা’, ‘লক্ষ্মণের শক্তিশেল’, ‘চলচিত্ত চঞ্চরি’, ‘শব্দকল্পদ্রুম’— এগুলো আকারে বড় নাটক। এছাড়া ছোট আকারের ‘অবাক জলপান’, ‘হিংসুটে’, ‘ভাবুকসভা’, ‘মামাগো’— এই চারটি নাটক রয়েছে।

সত্তরটি গল্প, ষোলটি জীবনী ও একশ আঠাশটি প্রবন্ধ সুকুমার রচনা করেন— যার মধ্যে দুটো ইংরেজিতে। কিন্তু মনে হয় এর চেয়েও অনেক বেশি তাঁর রচনা সম্ভার, কারণ তিনি লন্ডনে রবীন্দ্রনাথের বেশ কিছু কবিতা অনুবাদ করেন, অন্তত দুটো প্রবন্ধ তিনি ওখানে পাঠ করেন, যেগুলোর সন্ধান মেলেনি।

তাঁর গল্পের মধ্যে বিখ্যাত ‘হ য ব র ল’, ‘পাগলা দাশু’। তাঁর লেখা বিজ্ঞানের গল্প, জীবনী ও প্রবন্ধগুলো যেন তার বিজ্ঞান প্রতিভাকে মনে করিয়ে দেয়।

‘হেশোরাম হুঁশিয়ারের ডায়েরি’ আমাদের এক নতুন অ্যাডভেঞ্চারের সন্ধান দেয়। পুত্র সত্যজিতের হাতে পড়ে সে যেন সম্পূর্ণ রূপ পায় ‘প্রোফেসর শঙ্কু’তে। গুপী-বাঘার গল্পও যেন রচয়িতা দ্বিতীয় প্রজন্মের হাতে পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়।

সুকুমারের প্রবন্ধগুলো পাঠ করলে বোঝা যায় তাঁর পাণ্ডিত্য কত বহুমুখী ছিল। শুধু ‘ননসেন্স রাইম’ই নয়, তাঁর সাহিত্য প্রতিভা ছিল পিতার মতোই বিচিত্র ও সমৃদ্ধ।

তিনি প্রায় চৌত্রিশটি গান লিখেছিলে— যার বেশিরভাগের সুরকার ছিলেন তিনি নিজে।

জীবদ্দশায় তাঁর কোন গ্রন্থই প্রকাশ হয়নি। মৃত্যুর মাত্র ন’দিন পর ১৯ সেপ্টেম্বর ১৯২৩, তাঁর প্রথম ছড়ার গ্রন্থ ‘আবোল তাবোল’ প্রকাশিত হয়।

তাঁর মৃত্যুর সময় পুত্র সত্যজিতের মাত্র আড়াই বছর বয়স, পরবর্তী জীবনে যিনি পিতার রচনা সম্ভারকে সকলের কাছে পৌঁছে দিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেন।

সুকুমার রায় ১৯২৩ সালের আজকের দিনে (১০ সেপ্টেম্বর) কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন।

More from BooksMore posts in Books »
More from InternationalMore posts in International »
More from Writer/ LiteratureMore posts in Writer/ Literature »

Be First to Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.