Press "Enter" to skip to content

শিবনাথ শাস্ত্রী ছিলেন চিন্তাবিদ, সাহিত্যিক, শিক্ষাব্রতী, সমাজ-সংস্কারক, পন্ডিত এবং ব্রাহ্মধর্ম প্রচারক হিসেবে ছিলেন সমধিক পরিচিত। ছিলেন উনিশ শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদ…….।

জন্মদিনে স্মরণঃ শিবনাথ শাস্ত্রী

চিন্তাবিদ, সাহিত্যিক, শিক্ষাব্রতী, সমাজ-সংস্কারক, পন্ডিত এবং ব্রাহ্মধর্ম প্রচারক হিসেবে তিনি ছিলেন সমধিক পরিচিত। তিনি ছিলেন উনিশ শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদ। সমাজ উন্নয়নের ধারায় তাঁর অবদান আজও গভীয় শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়।

তিনি উজ্জ্বল আলোকিত মানুষ শিবনাথ শাস্ত্রী।

তাঁর পিতার নাম হরানন্দ ভট্টাচার্য আর মাতা কামিনী ভট্টাচার্য। উনিশ শতকের আরেক আলোকিত মানুষ,
বিশিষ্ট সমাজ-সংস্কারক, ‘সোমপ্রকাশ’ (১৮৫৮) পত্রিকার সম্পাদক দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ ছিলেন তাঁর মামা।

তিনি মামার আদর্শেই বড় হতে থাকেন। শৈশব-কৈশোরেই
নানা বিষয়ে তিনি কৌতূহলী হয়ে ওঠেন। অন্য বালকদের মতো খেলাধুলায় তেমন মন ছিল না শিবনাথের, বরং মামার তত্ত্বাবধানে বিভিন্ন বিষয়ের গ্রন্থপাঠে আগ্রহী হয়ে ওঠেন
তিনি। এভাবে শৈশব-কৈশোরেই শিবনাথের চেতনায় উপ্ত হয়েছিল উত্তরকালীন বিপুল সম্ভাবনার বীজ।

এ-কারণে মামা দ্বারকানাথের তত্ত্বাবধানেই শেষ হয় তাঁর বাল্যের পাঠ। অতঃপর মামার ইচ্ছানুসারে শিবনাথ ভর্তি হলেন সংস্কৃত কলেজিয়েট স্কুলে। পরবর্তীতে শিবনাথ ভর্তি হন কলকাতার বিখ্যাত সংস্কৃত কলেজে। সেখান থেকে ১৮৭২ সালে সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যে তিনি এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন।

এম এ পরীক্ষায় ভালো ফল লাভ করায় তিনি অর্জন করেন ‘শাস্ত্রী’ উপাধি। অতঃপর পারিবারিক পদবি ‘ভট্টাচার্য’-এর পরিবর্তে তাঁর নামের সঙ্গে যুক্ত হয় ‘শাস্ত্রী’ উপাধি এবং তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন শিবনাথ শাস্ত্রী নামে।

উনিশ শতকের মধ্যপাদে কলকাতা শহরে ব্রাহ্মধর্ম ব্যাপকভাবে বিকশিত হয়। সে-সময়ে শিক্ষিত যুবকদের পক্ষে ব্রাহ্মধর্মের প্রভাব এড়ানো সম্ভব ছিল না। শিবনাথও ব্রাহ্মধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। তাঁর বাবা হরানন্দ ছিলেন রক্ষণশীল গোঁড়া ব্রাহ্মণ। কাজেই ছেলের ব্রাহ্ম- ধর্মপ্রীতি তিনি ভালো চোখে দেখলেন না। শিবনাথের সঙ্গে হরানন্দের মতবিরোধ চরম আকার ধারণ করে। এই নিয়ে বাপ-ছেলেতে মুখ দেখা বন্ধ হয়ে যায়।

১৮৬৯ সালের ২২ আগস্ট শিবনাথ আনুষ্ঠানিকভাবে ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণ করেন। মূর্তিপূজা ত্যাগ করেন শিবনাথ, ছেদ করেন পরিবারের সঙ্গে সকল সম্পর্ক। পিতা হরানন্দ, শিবনাথকে বাড়ি থেকে বের করে দেন। স্ত্রীকে নিয়ে শিবনাথ চিরকালের মতো বাড়ি থেকে বের হয়ে যান।

ক্রমে শিবনাথ ব্রাহ্মসমাজের নেতৃত্বের আসনে অধিষ্ঠিত হন। ইতোমধ্যে ১৮৬৮ সালে ব্রাহ্ম-আন্দোলনের নেতা কেশবচন্দ্র সেন প্রতিষ্ঠা করেন Indian Reforms Association। এ সংস্থার উদ্দেশ্য ছিল মদ্যপান নিবারণ, শিক্ষা প্রসার, সুলভ সাহিত্য ও কারিগরি জ্ঞানের প্রচার, নারীশিক্ষা তথা নারী মুক্তি।

এসব আদর্শের প্রতি একাত্মতা ঘোষণা করে শিবনাথ যোগ দেন Indian Reforms Association-এ। শিবনাথ, কেশবচন্দ্রের প্রধান সহযোগী হিসেবে এ সময় সমাজ সংস্কারমূলক অনেক কাজের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন নারী- শিক্ষার পক্ষে তিনি গ্রহণ করেন দৃঢ় অবস্থান, বিধবাদের বিয়ের পক্ষে তিনি উচ্চারণ করেন জোরালো বক্তব্য।

শিবনাথ শাস্ত্রী, সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, আনন্দমোহন বসু প্রমুখের উদ্যোগে ১৮৭৬ সালে গঠিত হয় Indian Association। এই সংস্থাই হলো ভারতীয় রাজনীতির প্রথম সংঘবদ্ধ প্রয়াস। এই সংস্থার অনুপ্রেরণাতেই ১৮৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস।

দেশের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায় ১৮৭৭ সালে শিবনাথ শাস্ত্রী গঠন করেন ‘গুপ্ত বৈপ্লবিক সমিতি’। এই সংস্থার প্রধান কর্মসূচি ছিল– জাতিভেদ অস্বীকার, সরকারি চাকরি
প্রত্যাখ্যান, সমাজে নারী ও পুরুষের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা, অশ্বারোহণ ও বন্দুক চালনা শিক্ষা, জাতীয়তামূলক ও সমাজ সংস্কারমূলক শিক্ষা এবং পূর্ণ রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা। এসব উদ্দেশ্য থেকেই শিবনাথ শাস্ত্রীর রাজনৈতিক চেতনার পরিচয় পাওয়া যায়।

১৮৭৪ সালে শিবনাথ শাস্ত্রী দক্ষিণ কলকাতার ভবানীপুরস্থ সাউথ সুবার্বন স্কুলের প্রধান শিক্ষক পদে যোগ দেন। দুবছর পর তিনি যোগ দেন হেয়ার স্কুলে, সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষক রূপে। এ সময় মামা দ্বারকানাথ শিবনাথ শাস্ত্রীর
ওপর হরিনাভী স্কুল পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ করেন। তাঁর দক্ষ পরিচালনায় উল্লিখিত স্কুলগুলোতে পঠন-পাঠনে ইতিবাচক নানা পরিবর্তন সূচিত হয়। রাজনৈতিক কারণে ১৮৭৮ সালে হেয়ার স্কুলের শিক্ষকতার চাকরি থেকে তিনি স্বেচ্ছায় ইস্তফা গ্রহণ করেন।

শিবনাথ শাস্ত্রীর বর্ণাঢ্য ও উজ্জ্বল কর্মজীবনের এক গৌরবজনক অধ্যায় তাঁর সাংবাদিক-জীবন। মামা দ্বারকানাথ-প্রতিষ্ঠিত ‘সোমপ্রকাশ’ পত্রিকার সঙ্গে তিনি নানাভাবে জড়িত ছিলেন।

১৮৮৩ সালে শিবনাথ শাস্ত্রীর সম্পাদনায় ব্রাহ্মসমাজের পক্ষ থেকে ‘সখা’ নামে ভারতের প্রথম কিশোর মাসিক প্রকাশিত হয়। অভিন্ন সময়ে ‘তত্ত্বকৌমুদী’ (১৮৮২) এবং ‘ইন্ডিয়ান মেসেজ’ (১৮৮৩) নামে দুটি ক্ষণস্থায়ী পত্রিকা সম্পাদনা করেন শিবনাথ শাস্ত্রী। ১৮৯৫ সালে তাঁর সম্পাদনায়
প্রকাশিত হয় বিখ্যাত কিশোর মাসিক ‘মুকুল’।

ভারতবর্ষ ও ইংল্যান্ডের সমাজকে তুলনামূলক দৃষ্টিতে বিচার করার মানসে ১৮৮৮ সালে শিবনাথ শাস্ত্রী ইংল্যান্ড গমন করেন। ছয় মাস তিনি বিলেতে প্রবাসজীবন যাপন করেন।

বাংলা সাহিত্যের একজন খ্যাতিমান লেখক হিসেবে শিবনাথ শাস্ত্রীর অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়। তাঁর লেখা কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, ইতিহাস, আত্মজীবনী বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। শিবনাথ শাস্ত্রী যেসব কাব্য প্রকাশ করেন, তার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য– ‘নির্বাসিতের বিলাপ’, ‘পুষ্পমালা’, ‘হিমাদ্রি কুসুম’, ‘পুষ্পাঞ্জলী’, ‘ছায়াময়ী’
‘পরিণয়’ ইত্যাদি।

শিবনাথ শাস্ত্রীর উল্লেখযোগ্য উপন্যাসের মধ্যে আছে- ‘মেজবৌ’, ‘নয়নতারা’, ‘যুগান্তর’, ‘বিধবার ছেলে’ উল্লেখযোগ্য।

হিন্দু ধর্মের নানামাত্রিক কুসংস্কার থেকে তিনি সমাজকে মুক্ত করার মানসে একের পর এক প্রবন্ধ লিখেছেন। শিবনাথ শাস্ত্রীর উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধগ্রন্থগুলো হচ্ছে– ‘এই কি ব্রাহ্ম বিবাহ?’, ‘খৃষ্টধর্ম’, ‘জাতিভেদ’, ‘বক্তৃতা স্তবক’, ‘মাঘোৎসব উপদেশ’, ‘মাঘোৎসব বক্তৃতা’, ‘প্রবন্ধাঞ্জলি’, ‘ধর্মজীবন’ ইত্যাদি।

১৯০৪ সালে প্রকাশিত হয় শিবনাথ শাস্ত্রীর কালজয়ী গ্রন্থ ‘রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ’– যা ইতিহাসের এক উল্লেখযোগ্য দলিল হিসেবে উত্তরকালে স্বীকৃতি লাভ করেছে।

ইংরেজি ভাষাতেও শিবনাথ শাস্ত্রী কয়েকটি গ্রন্থ রচনা করেন। তাঁর দুটি উল্লেখযোগ্য ইংরেজি গ্রন্থ– History of the Brahma Samaj এবং Men I have seen ।

১৯১৯ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর শিবনাথ শাস্ত্রী কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন।

শিবনাথ শাস্ত্রী ১৮৪৭ সালে আজকের দিনে (৩১ জানুয়ারি) পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার চাংড়িপোতা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

More from GeneralMore posts in General »

Be First to Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.