জন্মদিনে স্মরণঃ বা লা স র স্ব তী
বাবলু ভট্টাচার্য : বালাসরস্বতী– পুরো নাম থাঞ্জাভুর বালাসরস্বতী কেবলমাত্র একজন ভরত নাট্যম নৃত্যশিল্পীই নন, তিনি ছিলেন প্রতিবাদী এবং বিপ্লব সৃষ্টকারী শিল্পী। দেবদাসীদের নাচ, পরে যেটা ছিল পুরুষালি ধ্রুপদী ও পরম্পরাগত নৃত্যশৈলী, সেটাকে ভেঙে তিনি ভরত নাট্যমকে অন্যতম সেরা ভারতীয় ধ্রুপদী নৃত্যকলা হিশেবে মঞ্চে নিয়ে এসেছিলেন।
সাত বছর বয়সে বালাসরস্বতী কাঞ্চিপুরম শহরের দেবী মন্দিরে তাঁর আরঙ্গেত্রম (প্রথম জনসমক্ষে মঞ্চে ওঠা) করেছিলেন এবং তাঁর ছন্দবদ্ধভাবে সম্পাদিত গতিবিধি দর্শকদের স্তম্ভিত করে দিয়েছিল।
বড় হওয়ার সাথে সাথে বালাসরস্বতী ভরতনাট্যমকে তাঁর পেশা হিসেবে নেওয়ার প্রতিজ্ঞ আরো দৃঢ় হয়। তবে, তাঁর এই সিদ্ধান্তে পরিবার এবং সমাজ উভয় দিক থেকেই প্রচুর বিরোধিতার সম্মুখীন হয়েছিলেন।
পূর্ণকালীন পেশা হিসাবে নৃত্যকে তুচ্ছ করে দেখা হত। যেহেতু তাঁর পরিবার দেবদাসী সম্প্রদায়ের সাথে যুক্ত ছিল তাই তারাও তাঁর সিদ্ধান্তকে মেনে নিতে চায়নি। কিন্তু তাঁর মাতামহ বীণা তাঁর সম্ভাবনা বুঝতে পেরে তাঁকে গুরু কান্দাপ্পা পিল্লাইয়ের অধীনে নৃত্য প্রশিক্ষণে ভর্তি করেছিলেন।
একই সঙ্গে, তিনি চিন্নায়া নাইডু এবং গৌরী আম্মলের কাছেও অনুশীলন করতেন। গৌরী তাঁকে স্ত্রোত্রপাঠ এবং নৃত্যাভিনয় (অভিব্যক্তি) শিখিয়েছিলেন। তিনি এই মহিমান্বিতদের তত্ত্বাবধানে বিকশিত হয়ে উঠেছিলেন এবং নৃত্যশিল্পী হওয়ার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে দিনরাত অনুশীলন করতেন।
তিনি শৈশবকাল থেকেই পরিবারের মধ্যে সংগীত শেখেন এবং বিখ্যাত থানজাবর নট্টুভানর পরিবারের সদস্য বিশিষ্ট নৃত্যশিক্ষক কে কান্দ্প্পান পিল্লাইয়ের অধীনে তিনি চার বছর বয়সে নৃত্যের কঠোর প্রশিক্ষণ শুরু করেন।
তাঁর ছোট ভাইরা ছিলেন সংগীতশিল্পী টি রঙ্গনাথন এবং টি বিশ্বনাথন যারা উভয়ই ভারত এবং আমেরিকার বিশিষ্ট অভিনয়শিল্পী এবং শিক্ষক হয়ে উঠেন। তাঁর কন্যা লক্ষ্মী নাইট তাঁর মায়ের ধরনের এক বিশিষ্ট অভিনয়শিল্পী ছিলেন।
তার নাতি অনিরুদ্ধ নাইট আজও পারিবারিক রীতিতে অভিনয় করে চলেছেন, এবং আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের বালা সংগীত ও নৃত্য সমিতি এবং ভারতের বালাসরস্বতী স্কুল অব ডান্সের শৈল্পিক পরিচালক।
বিশ্বখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা সত্যজিৎ রায় তাঁর কাজের একটি প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করেছিলেন। তিনি বালাসরস্বতীর নাচ প্রথম দেখেন তাঁর ১৪ বছর বয়সে ১৯৩৫ সালে। সেই নাচ সত্যজিতের স্মরণে ছিল। ফলে ১৯৬৬ সালে যখন প্রস্তাব আসে বালা’কে নিয়ে তথ্যচিত্র করার, উনি তৎক্ষণাৎ রাজি হয়ে যান। ছবিটি নির্মিত হয় ১৯৭৬ এ। যদিও সংগ্রামী ব্যক্তি শিল্পী বালা নয়, তাঁর ছবিতে উঠে এসেছিল একজন মহৎ ভারতীয় ধ্রুপদী নৃত্যশিল্পী রূপে।
১৯২৫ সালে, সাত বছর বয়সে, নর্তকী হিসেবে বালাসরস্বতীর আত্মপ্রকাশ হয়েছিল। দক্ষিণ ভারতের বাইরে এই ঐতিহ্যবাহী রীতির নৃত্য প্রদর্শনে তিনিই ছিলেন প্রথম, ১৯৩৪ সালে কলকাতায় তিনি প্রথম নৃত্য প্রদর্শন করেন। কৈশোর বয়সে তিনি নৃত্য পরিকল্পক উদয়শঙ্করের চোখে পড়েন। উদয়শঙ্কর তাঁর প্রদর্শনের উৎসাহী প্রচারক ছিলেন, এই সময়ে তিনি বিদেশেও নৃত্য প্রদর্শন করার সুযোগ পান।
১৯৬০-এর দশকের গোড়ার দিকে তিনি পূর্ব এশিয়া, ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকা সহ অনেক দেশে পারফর্ম করে বিশ্বব্যাপী ভ্রমণ করেন। সেই দশকের পরে, ১৯৭০-এর দশক এবং ১৯৮০-এর দশকের গোড়ার দিকে, তিনি বারবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গেছেন ও থেকেছেন।
কারণ তিনি ছিলেন ওয়েসলিয়ান ইউনিভার্সিটি ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব আর্টস, মিলস কলেজ, ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয় এবং জ্যাকবসের বালিশ নৃত্য উৎসব সহ আরো অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং অভিনয়শিল্পী।
তাঁর আন্তর্জাতিক ব্যস্ততার পাশাপাশি নিজের দেশে তাঁর কার্যক্রমের মাধ্যমে, বিশেষত মাদ্রাজে, বালাসারস্বতী শুধুমাত্র ভারত নাট্যমের ঐতিহ্যগত স্টাইলে অগণিত শ্রোতাদের সামনে তুলে ধরেন নি, বরং এই শিল্পের অনেক নতুন অনুশীলনকারীকেও প্রশিক্ষণ দিয়েছেন।

তিনি অসংখ্য পুরস্কার পেয়েছিলেন, এর মধ্যে ছিল সংগীত নাটক আকাদেমি থেকে রাষ্ট্রপতির পুরস্কার (১৯৫৫), ভারত সরকারের কাছ থেকে বিশিষ্ট জাতীয় সেবার জন্য পদ্মবিভূষণ (১৯৭৭) এবং মাদ্রাজ সংগীত একাডেমি থেকে সংগীত শিল্পীদের জন্য দক্ষিণ ভারতের সর্বোচ্চ পুরস্কার সংগীত কলানিধি (১৯৭৩)।
৯ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৪ সালে ৬৫ বছর বয়সে মাদ্রাজে বালা’র মৃত্যু হয়।
বালাসরস্বতী ১৯১৮ সালের আজকের দিনে (১৩ মে) মাদ্রাজে জন্মগ্রহণ করেন।























Be First to Comment