Press "Enter" to skip to content

বাঙলার রেনেসাঁসের সর্বশেষ প্রদীপ ছিলেন তিনি। যথার্থ রেনেসাঁস-সাধক ছিলেন শিবনারায়ণ রায়। নানা ক্রটি- বিচ্যুতি থাকা সত্ত্বেও তিনি বাঙলার রেনেসাসের উত্তরাধিকারকে অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে দেখতেন……..।

জন্মদিনে স্মরণঃ শিবনারায়ণ রায়

বাবলু ভট্টাচার্য : বাঙলার রেনেসাঁসের সর্বশেষ প্রদীপ ছিলেন তিনি। যথার্থ রেনেসাঁস-সাধক ছিলেন শিবনারায়ণ রায়। নানা ক্রটি- বিচ্যুতি থাকা সত্ত্বেও তিনি বাঙলার রেনেসাসের উত্তরাধিকারকে অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে দেখতেন। এই দেখাটা একজন বিবেকী ভাবুকের, দায়িত্বশীল চিন্তকের। তিনি মনে করেতেন, যে মহৎ কর্মে অপূর্ণতা থাকে, তাকে পূর্ণতা দেবার গুরুদায়িত্ব উত্তর-প্রজন্মের। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে শিবনারায়ণ রায় সেই অসামান্য দায়িত্ব বলা চলে সারা জীবনই পালন করবার চেষ্টা করে গেছেন।

শিবনারায়ণ রায় ছিলেন একাধারে সাহিত্যিক, সমালোচক, মানববাদী দার্শনিক, ইতিহাসবিদ এবং সম্পাদক। তিনি পিতৃনিবাস বরিশাল জেলার রায়েরকাঠি গ্রাম। পিতা উপেন্দ্রনাথ বিদ্যাভূষণ শাস্ত্রী ছিলেন নাট্যকার, লেখক, শিক্ষাবিদ। মাতা রাজকুমারী দেবী।

শিবনারায়ণ রায় প্রধানত ইংরেজি এবং দর্শন অধ্যয়ন করেন। তবে ইতিহাস, সমাজতত্ত্ব এবং শিল্পকলায়ও তাঁর অবদান রয়েছে। কলকাতা সিটি কলেজে ইংরেজির অধ্যাপক হিসেবে তিনি তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন ১৯৪৫ সালে। ১৯৬৩ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত তিনি মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারতবিদ্যা বিভাগের প্রধান ছিলেন।

এ ছাড়া তিনি অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ, শিকাগো এবং স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় সমেত ইউরোপ, আমেরিকা এবং জাপানের বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিজিটিং প্রফেসর ছিলেন।

জীবনের প্রথমপর্বে তিনি ছিলেন কট্টর মার্কসবাদী। পরে, তিনি মানবেন্দ্রনাথ রায়ের সান্নিধ্যে এসে তাঁর আদর্শে প্রভাবিত হন। মানবেন্দ্রনাথ রায় সুপরিচিত ছিলেন এম এন রায় নামে। শিবনারায়ণ রায়, এম এন রায়ের র‌্যাডিকেল হিউম্যানিজম দর্শনের একজন প্রধান প্রবক্তা ও অনুসারী।

এম এন রায় এক সময়ে লেনিনের উপদেষ্টা এবং দ্বিতীয় কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনালের সদস্য ছিলেন। তাছাড়া এম এন রায় রাশিয়ার বাইরে প্রথম কমিউনিস্ট দল করেন মেক্সিকোতে৷ ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টিও প্রতিষ্ঠা করেন তিনি, কিন্তু মার্কর্সীয় রক্তক্ষয়ী ও মানবতা-বিরোধী আদর্শে বিশ্বাস রাখতে পারেননি। তাই তিনি র‌্যাডিকেল হিউম্যানিজমের দর্শন প্রচার করেন।

শিবনারায়ণ রায় এম এন রায়ের মতো সাম্যবাদী সমাজ গঠনের উদ্দেশ্যে সহিংস বিপ্লব সমর্থন করতে পারেননি; বরং গণতান্ত্রিক পন্থায় সমাজ পরিবর্তন এবং মানবতার বিকাশ ঘটানোর পক্ষপাতী ছিলেন।

শিবনারায়ণ রায় নানা বিষয়ে পঞ্চাশটিরও বেশি গ্রন্থ প্রকাশ করেন। এসবের মধ্যে ছিল সাহিত্য, দর্শন, ইতিহাস এবং সমাজ-সংস্কৃতি। তিনি কয়েকটি কাব্যগ্রন্থও প্রকাশ করেছিলেন। যেমন— সাহিত্যচিন্তা, মৌমাছিতন্ত্র, কবির নির্বাসন ও অন্যান্য ভাবনা, গণতন্ত্র সংস্কৃতি ও অবক্ষয়, রবীন্দ্রনাথ শেক্সপীয়র ও নক্ষত্র সংকেত, স্রোতের বিরুদ্ধে, রেনেসাঁস, স্বদেশ স্বকাল স্বজন এবং Radicalism : Philosophy of democratic Revolution, Socialism in India, The Intelligentsia.

একজন সম্পাদক হিসেবেও তিনি খ্যাতিমান ছিলেন। ১৯৫২ সালে ‘উত্তরসূরী’ এবং পরে ‘জিজ্ঞাসা’ নামে একটি মননশীল ত্রৈমাসিক পত্রিকা প্রকাশ করেন। এটি তিনি বিশেষ কৃতিত্বের সঙ্গে দীর্ঘ বাইশ বছর (১৯৮০-২০০২) সম্পাদনা করেন। এম এন রায়ের র‌্যাডিকেল হিউম্যানিস্ট পত্রিকাও তিনি কিছু কাল সম্পাদনা করেন।

সম্পাদক হিসেবে তাঁর আর একটি বিশেষ কৃতিত্ব হচ্ছে চার খন্ডে এম এন রায়ের নির্বাচিত রচনাবলী Selected Works of M. N. Ray শিরোনামে প্রকাশ করেন। অপর একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান এম এন রায়ের জীবনী লেখা। শিবনারায়ণ রায় এই জীবনীও লিখেছেন চার খন্ডে— In Freedom’s Quest : Life of M. N. Ray, (১৯৯৯-২০০৭) শিরোনামে।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ তিনি সমর্থন করেন এবং বিভিন্ন দেশের পত্র-পত্রিকায় বাংলাদেশের পক্ষে মতামত গড়ে তোলার জন্যে অনেক লেখালেখি করেন। তিনি ধর্মে আস্থাহীন ছিলেন।

২০০৮ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি, শান্তিনিকেতনে তাঁর মৃত্যু হয় ৷

শিবনারায়ণ রায় ১৯২১ সালের আজকের দিনে (২০ জানু) কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন।

Be First to Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.