ফাঁসিই কি সমস্যার সমাধান?
_________________________
সুজিৎ চট্টোপাধ্যায়: কলকাতা, ১৯শে জানুয়ারি ২০২০ তারিখ পে তারিখ,তারিখ পে তারিখ।
ভারতীয় আইনের বিচার ব্যবস্থার প্রতি বীতশ্রদ্ধ মানুষের ক্ষোভ হিন্দি ছবির সংলাপে যুক্ত হতেই সুপারহিট। এই মুহূর্তে এই তারিখ পে তারিখের গোলকধাঁধায় ধৈর্যের সীমার বাঁধ ভাঙার পর নির্ভয়ার মা আশা দেবী কিছু রূঢ় কথা বলে ফেলেছেন। নতুন বছরে ২২ জনুয়ারি দিন ধার্য হয়েছিল নির্ভয়া কাণ্ডের চার কুখ্যাত অপরাধীর ফাঁসি। কিন্তু আইনি মারপ্যাঁচে অপরাধীর তরফে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চাওয়া হয়। যদিও রাষ্ট্রপতি সেই আবেদন অগ্রাহ্য করেছেন তবু আইনি নিদানে নতুন ফাঁসির দিনক্ষণ স্থির করতে ১৪দিন সময়ের কথা বলা হয়েছে। সাংবিধানিক আর কোনো সংকট দেখা না দিলে আগামী ১ ফেব্রুয়ারি সকাল ছ়টায় তিহার জেলের তিন নম্বর সেলে চার অপরাধীর একসঙ্গে ফাঁসি হতে চলেছে। ফাঁসি দেওয়ার জন্য চার আসামির গলার মাপ নেওয়া সারা। দেহের ওজনের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে ফাঁসির দড়ির অপর প্রান্তে বালির বস্তা তৈরির কাজও শেষ। ফাঁসির তিনদিন আগে তিহার জেলে পৌঁছে যাবেন ফাঁসুড়ে। শুরু হবে ফাঁসির দড়িতে মোম আর পাকা কলা মাখিয়ে দড়ি মসৃণ করার কাজ।
উল্লেখযোগ্য ঘটনার প্রেক্ষিতে ফাঁসির নির্দেশ আদালত দিলেই মানুষ দুটি দলে বিভক্ত হয়ে পড়েন। একদল বলেন, উচিত শাস্তি। আর একদল বলেন সভ্যসমাজে ফাঁসি এক অমানবিক শাস্তি প্রথা। ইতিমধ্যে ঘৃতাহুতি পড়েছে প্রবীণ আইনজীবী ইন্দিরা জয়সিংহের একটি টুইটে। ইন্দিরা টুইটারে নির্ভয়ার মাকে অনুরোধ জানিয়ে বলেছেন,’আশা দেবীর যন্ত্রণার কথা জেনেও আমি তাকে অনুরোধ করবো সোনিয়া গান্ধীর মতো তিনিও যেন দোষীদের ক্ষমা করে দেন। আমরা আপনার পাশে সমব্যাথী। কিন্তু মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে। মেয়ের শোকে কাতর আশাদেবী নিজেকে সংযত রাখতে পারেন নি। তিনি ক্ষোভে ফেটে বলেন, সারা ভারত দোষীদের মৃত্যুদণ্ডের নির্দেশে খুশি, সেখানে একজন মহিলা হয়েও ইন্দিরা এই ক্ষমা করার কথা বলেন কীকরে? নির্ভয়ার বাবা বলেন, আমরা সোনিয়ার মতো মহৎ নই। ইন্দিরা জয়েশিংহের ক্ষমা চাওয়া উচিত। নিঃসন্দেহে নির্ভয়াকে যেভাবে নৃশংস অত্যাচার করে যৌন নির্যাতন করেছে তা একথায় জঘন্য অপরাধ।অমানবিক। সুস্থ সমাজের কলঙ্ক। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে মারের বদলে মার, কিম্বা খুনের বদলে খুন সভ্য সমাজের বিধান হতে পারে কি? এমনই প্রশ্ন তুলছেন বিশ্বের মানবতাবাদী সংগঠন অ্যমেনেস্টি ইন্টারন্যাশানাল সংস্থা এবং ভারতের বিভিন্ন মানবতাবাদী কিছু সংগঠন।
ইতিমধ্যে বেশকিছু দেশ মৃত্যুদণ্ড রদ করেছে তাদের দেশে। অন্টিগুয়া ও বারমুডা, বাহামা, বর্বদোজ, বেহলিজ, কমোরোস, কিউবা, কঙ্গো প্রজাতন্ত্র , জর্মিনিকা, ইথিওপিয়া, গাম্বিয়া, গায়েনা, জ্যামাইকা, লেবানন, লেস্থ, কাতার, সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেডিস, সেন্ট লুসিয়া, সেন্ট ভিনসেন্ট, ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোবাগো, উগান্ডা ও জিম্বাবুয়ে। ফাঁসি হয় না গিনি ও মঙ্গলিয়াতেও। মালয়েশিয়া তেও সম্প্রতি ফাঁসি রদ হয়েছে।এছাড়াও সাহারা আফ্রিকার ২০ টি দেশে এখন মৃত্যুদণ্ড নেই। জাতি সংঘের হিসেব, সারা পৃথিবীতে ১৭০ টি দেশ মৃত্যুদণ্ড রদ করেছে।
ইতিহাস বলছে, হাজার দেড়েক বছর আগে পাঁচ এর শতকের শুরুতে ইংল্যান্ডে অ্যাংলো স্যাকসন উপজাতি চরম অপরাধের শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড চালু করে। কবি হোমারের লেখাতেও মেলে ফাঁসির কথা। দশম শতকে ফাঁসির চল ছিল সবচেয়ে বেশি। পরে ইংল্যান্ডে ফাঁসির চল বন্ধ করেন ইংল্যান্ডের উইলিয়াম দি কনকার। আবার তা চালু করেন রাজা প্রথম হেনরি। আবার আর এক দল ইতিহাসবিদরা বলেন, আড়াই হাজার বছর আগে প্রথম ফাঁসির চল শুরু হয় সেদিনের পারস্যে। আজ যা ইরান। অনেক দেশ মধ্যযুগীয় প্রথা মনে করে ফাঁসি প্রথা রদ করেছে। মানবতাবাদীদের যুক্তি, ফাঁসি দিয়ে অপরাধ বন্ধ হবে না। আবার ফাঁসির পক্ষে যাঁরা তারা বলেন, মৃত্যু ভয় অপরাধীদের সংখ্যা কমাবে। মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, অপরাধী যখন অপরাধ করে তখন তাদের মৃত্যু ভয় থাকে না বরং আইনি শাস্তি বিধান মানুষকে আরও অপরাধী করে। রাষ্ট্র এই যুক্তিকে যে সমর্থন করে তার প্রমাণ কারাগারের নাম পাল্টে সংশোধনাগার রাখা। আজকাল বিদেশের মতো এদেশেও বিচারকেরা অনেক ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক সমাজসেবা, বৃদ্ধাশ্রমে দান জরিমানা হিসেবে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে যা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক।
ধর্ষণ, খুন এই ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটে খুন কা বদলা খুন মানসিকতায়। অথচ বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মানুষ যে ধর্মে বিশ্বাসী সেই খ্রিস্টান ধর্মে প্রভু যীশু বলেছেন,পাপ কে ঘৃণা করো, পাপীকে নয়। কিন্তু খ্রিস্টান ধর্মে বিশ্বাসী মানুষের সিংহভাগ হিংসাতেই আস্থা রাখেন। আবার ক্যাথলিক ধর্মের মানুষজন ফাঁসির সপক্ষে তুলে ধরেন ওল্ড টেস্টামেন্ট।
(দ্বিতীয় কিস্তির প্রতিবেদন আগামী দিন )







Be First to Comment