Press "Enter" to skip to content

[প্রদীপের সঙ্গে আলাপ=’প্রলাপ’] (পর্ব- ০০৬)
——-ফুলশয্যার গোপন কথা——

Spread the love


ডঃ পি সি সরকার : (জুনিয়র) বিশ্বখ্যাত জাদুশিল্পী ও বিশিষ্ট লেখক। কলকাতা, ৫, ডিসেম্বর, ২০২০। বাবা-মার ফুলশয্যায় কী কথা হয়েছিলো, সেটা সন্তানদের পক্ষে জানা অসম্ভব। তাঁরা তো তখন পৃথিবীতে আসেই নি। শুধু তাই নয়, ওই একান্ত গোপন কথাবার্তা তো বন্ধ দরজার বাইরে যাবার কথা নয়। কিন্তু আমার বাবা-মার ফুলশয্যার ক্ষেত্রে তা ঘটেনি। অনেক কথাই আমি জানতে পেরেছি। না, কোনো আড়িপাতা কিম্বা খাটের তলায় লুকিয়ে থাকা মানুষের কাছ থেকে নয়। একেবারে সরাসরি, মার মুখ থেকেই শোনা। বাবা যখন বিদেশে যেতেন, মা থাকতেন কলকাতায়, বাড়ি সামলাতে। তখন আমাদের পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে মা আমাকে একজন ভালো কথাবলার সঙ্গী খুঁজে পেয়েছিলেন। আমার নীরব শ্রোতার ভূমিকা, এবং আবেগে আপ্লুত হয়ে মাকে সান্তনা দেওয়ার বা সরল মনে উপদেশ দেওয়া, চোখের জল মুছিয়ে দেওয়া বা ঠাকুরের ছবি এনে মার মাথায় ছুঁইয়ে দেওয়াটাই ছিলো সেই প্রাণ-সখা বনে যাওয়ার গোপন চাবিকাঠি। তাছাড়া বুক-ফুপিয়ে কাঁদতে তো একটা পার্টনার চাই। আমি ছিলাম সদা-সহজলভ্য সেই পার্টনার। তখনকার দিনে তো আর STD. বা ISD… ইত্যাদি ছিলনা। চিঠিপত্রের ওপর ভরসা করেই চলতো স-সারের ভাব- ভলোবাসা।

হ্যা ট্রাঙ্ককলে যে কথাবার্তা হতোনা তা নয়। তবে তার এতো অস্পষ্টভাবে কানে আসতো যে চেঁচিয়ে পাড়া মাত করে গোপন কথা বলতে হতো। গোপনীয়তা রক্ষার তাগিদে সে কারণে চিঠিই ছিলো একমাত্র মাধ্যম। মা, বাবার চিঠি পেলেই কেমন যেন ছটফট করে উঠতেন। প্রথমে প্রণাম করতেন সেই অদৃশ্য বিধাতার উদ্দেশ্যে। যেন খামের ভেতর ভালো সংবাদ থাকে সেই আশায়। তারপর আড়ালে গিয়ে চিঠি খুলতেন, পড়তেন। কোনো কোনো দিন দেখতাম, চিঠি পড়ে একা একাই সলজ্জভাবে হাসছেন। আবার কখনো দেখতাম কাঁদছেন। মানুষ আত্মবিশ্বাসের সময় অনেক গোপন কথা প্রকাশ করে ফেলে। তেমন ভাবেই বাবার মৃত্যুর পর তার মুখ থেকেই তাঁর অজান্তে ই তাঁদের বন্ধ দরজার ওপাশের অনেক কাহিনী জানতে পারি।

বাসরঘরে নব-বধূকে বাবা শুনিয়েছিলেন তাঁর স্বপ্নের কথা। বলে ছিলেন কী কী তাঁর করার ইচ্ছে। স্বপ্ন। বলেছিলেন, “আমাদের দেশ, অসম্ভবকে সম্ভব করার দেশ। আমাদের স-স্কৃতি বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ। বিদেশী ওরা আমাদের সবকিছুকে নষ্ট করতে চায়। আমি পৃথিবীকে দেখাতে চাই যে ভারতের মেধা সবার সেরা। ম্যাজিকে মন্ত্র-তুক তাক নেই। আছে বুদ্ধির, বিজ্ঞানের কারসাজি। আমরা তো ধনী নই। ধন দিয়ে ওদের সঙ্গে লড়াইয়ে পারবো না। কিন্তু বুদ্ধি, মেধা, সাধনা, একাগ্রতা…দিয়ে বিশ্বজয় করতে পারবো। আমি সাধারণ একটা অজ-পাড়াগায়ের ছেলে। কিন্তু আমি জানি, আমি পারবো। সর্বশ্রেষ্ঠ হয়ে দেখাতে পারবো। বিরাট দল বানাবো। পৃথিবীর সব দেশে যাবো। ভারতের পতাকা নিয়ে দাপিয়ে বেড়াবো। লন্ডন, প্যারিস, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া-সব দেশেই উড়বে বাংলার জাদুর বিজয় পতাকা।”


বড় বড় চোখ করে, ঘোমটার ফাঁক দিয়ে মা সে-সব কথা শুনছিলেন। ঘোমটা সড়িয়ে কোমরে আঁচল জড়িয়ে মা উঠে দাঁড়িয়ে বলে ছিলেন, ” আমি তোমাকে সাহায্য করবো। তোমার সঙ্গে আছি। যা বলবে, কথা দিচ্ছি, তাই করবো। এক সাথে মরবো।”
বাবা বলেছিলেন, “অত ইমোশনাল হয়ো না। কাজ ভাগ করে নিতে হবে। আমি করতে যাবো লড়াই।তুমি রক্ষা করবে আমাদের দূর্গ…বাড়ি, স-সার, বাবাকে, মাকে, আমাদের সন্তানদেরকে। আমি জিতে আসবো…তারপর একসাথে শান্তিতে জীবন কাটাবো।…”


মা তখন বাবাকে কথা দিয়েছিলেন, বাড়ি ঘর সংসারের দায়িত্ব…আমায় শিখিয়ে দাও…আমি নিলাম। যতক্ষণনা পর্য্যন্ত তোমার স্বপ্ন পূরণ হয়, আমি বাড়ি সামলাবো। তারপর দুজনে একসাথে বেড়াতে যাবো। তোমাকে তোমার স্বপ্ন সফল করতেই হবে।” বাবা মাকে কথা দিয়ে ছিলেন, স্বপ্নকে সত্যি করবেন। বাবা কথা রেখেছেন। ইতিহাস তার সাক্ষী। কিন্তু তার সঙ্গে যে আরেকজনের সুখ, শান্তি, পাওনার সব কিছু খারিজ করে দিয়েছেন তার তিনি এবং আমাদের সমাজ খেয়ালে রাখেননি। প্রথম প্রথম না বুঝলেও, এই পরিণত বয়সে বেশ বুঝতে পারি, বাবা পুরস্কার পেলেন, সফল হলে আনন্দে আত্মহারা হয়ে কেন প্রথমে হাসতেন এবং তারপরই আড়ালে গিয়ে কাঁদতেন! না, সেটা শুধু আনন্দাশ্রু নয়। মা কাঁদতেন একটা হারিয়ে যাওয়া বালিকা বধূর নীরব ব্যথার জন্য। আত্মবলী দেওয়া একজন নারীর ব্যক্তিগত স্বপ্নটা হাওয়ায় মিলিয়ে যাওয়ার জন্য। কাজে বিভোর, উত্তরোত্তর
উন্নতি করে দেশের মুখ উজ্জ্বল করায় উন্মত্ত সেই এঁদো গ্রামের সফল ছেলেটা যে তার তেরো বছর বয়সের নববধূর কাছে যে একসাথে বেড়াবার , আনন্দে জীবন কাটাবার শপথ করে ছিলেন, তার কি হবে ?


বাবা সে খবর রাখেন নি। আর রাখেননি বলেই নাকি ‘স্বার্থপরের মতো’ চলে গেলেন, মা-কে কিছু না বলেই। বাবার মৃতদেহ তখন বাক্সবন্দী হয়ে কলকাতায় এসে পৌঁছোয়, তখন মা নাকি তার ওপর আছড়ে পড়ে কাঁদেন। তারপর হঠাৎ কেমন যেন কুঁচকে সরে গিয়ে গালাগাল দিয়ে বলেন, “কাপুরুষ”! সেই হৃদয় বিদারক দৃশ্যের সাক্ষী আমি নই। কারণ, আমি তখন জাপানে। অন্যের কাছেই এ কথা শুনেছি। লোকে বলে, মা নাকি আর কাঁদেন নি। নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে বলেছিলেন, “এই বাক্সটাতে আমার স্বামী নন, একজন মহাপুরুষ শুয়ে আছেন। উনি সবার প্রণম্য। তোমাদের সম্পত্তি।” মাকে জড়িয়েই বেঁচে আছি। শুধু কি আমি? বাবাও বেঁচেছিলেন মা-কে আঁকড়ে। সেজন্যই বারবার তিনি বলতেন, ‘বাসন্তী হচ্ছে আমার জীবনের ম্যাজিক। সব ম্যাজিকের সার কথা। ওর আত্মত্যাগের ঋণ আমি কখনো শোধ করতে পারবো না। ও না থাকলে আমি প্রতুল চন্দ্র সরকার কোনদিনও পি সি সরকার হতে পারতাম না।

বাবা আজ অমরলোকে। না, উনি মারা যান নি। মারা গেছেন বলে মনেও হয় না। মনে হয়, অন্যান্য বারের মতো তিনি একটা সফরে গেছেন। ম্যাজিক দেখাতে। তবে এবারের সফরটা যেন একটু বেশি লম্বা। মা এখন আর ফুপিয়ে কাঁদেন না। বরং ছোট্টো একটা মেয়ের মতো একা একা কথা বলে, অদৃশ্য কার সঙ্গে যেন খেলা করেন। তাঁর জন্মদিনে পুতুল খেলার মতোই তাঁর ছবির সামনে পায়েস রেঁধে রাখেন। তারপর এক সময় সেই পায়েস আমাদের প্রসাদের মতো বিতরণ করেন। নিজে কিন্তু একটুও খান না। কেন খান না, কে জানে।

পুনশ্চ:- মা এখন হাসছেন। খিল খিল করে হাসছেন। গত ছাব্বিশে ডিসেম্বর, ২০০৯ খ্রীষ্টাব্দে,
মা চলে গেছেন অমরলোকে, বাবার কাছে। ফুলশয্যার বন্ধ দরজার ভেদ করেও আমি বাইরে থেকে তাঁদের হাসির শব্দ শুনতে পাই।

More from GeneralMore posts in General »

Be First to Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Mission News Theme by Compete Themes.