Press "Enter" to skip to content

[প্রদীপের সঙ্গে আলাপ=প্রলাপ]
(পর্ব-০১৫)
‘ওরা’ না শোনে ধর্মের কাহিনী….।


ডঃ পি. সি. সরকার (জুনিয়র) বিশ্বখ্যাত জাদুশিল্পী ও বিশিষ্ট লেখক। কলকাতা, ২৫, ডিসেম্বর, ২০২০। আমি আমাদের ধর্ম, সনাতন ‘হিন্দু’ ধর্ম নিয়ে খুব গর্বিত। যতো দিন যাচ্ছে, ততোই এই গর্বটা ফুলে বড়ো হচ্ছে । পরিস্কার বুঝতে পারছি আমি আসলে, কিছুই জানিনা। জানবার মতো অতো ‘মাথা’ই আমার নেই। কারুরই থাকে না। আরে বাবা, এইটুকু তো মস্তিষ্কের খোপ, মানে ঘিলুর জন্য বরাদ্দ জায়গা। তাতে কি সব কিছু জেনে ঠেসে আঁটিয়ে রাখবার মতো উপায় আছে? স্বয়ং কার্ল মার্ক্স বলেছেন, “প্রতিটি মানুষই তার নিজের অজান্তে ইতিহাস রচনা করছেন।” তাহলে এই এতো লোকের গড়া এতো ইতিহাসের খবর রাখবোটা কোথায়? এই যে আমি ঈশ্বর সম্পর্কে কিছু না জেনেই পাণ্ডিত্য দেখাচ্ছি সেটাও একটা ইতিহাসের ভ্রান্ত হলেও রচনা। এই ক্রমবর্ধমান ইতিহাস ঠাসতে তো জায়গা চাই ।
আমরা স্বাধীন। আমার যদি প্রাণভরে ব্যক্তি-স্বাধীনতাপূর্ণ ‘ভুল’ করার স্বাধীনতা না থাকে, তাহলে আমি কিসের স্বাধীন? আব্বুলিশ কথাটা আছে কেন তাহলে ?

ঈশ্বর নিরাকার। শুরুতে নাকি কিচ্ছু ছিলো না। ‘ছিলোনা’-টাও ছিলোনা। সুতরাং ঈশ্বরও ছিলেন কিনা কে জানে? বেদ-এর শুরুতেই এসব কথা লেখা আছে। তারপর লেখা আছে, তিনি নাকি ‘স্বয়ং-ভূ’ , শম্ভু। নিজেই নিজেকে জন্ম দিয়েছেন। তখন কিভাবে কে জানে ‘শক্তি’র হলো সৃষ্টি। তার না ছিলো কোনো রূপ বা চেহারা, না ছিলো কোনো ঠিকানা বা আয়না । তার নাকি আবার মৃত্যু-টৃত্যুও নেই । যা-ব্বাবা। সে আবার কি কথা !! মুনি-ঋষিরা কি-সব হাবরি-জাবরী বলে গুলিয়ে দেবার ধান্ধায় ছিলেন নাকি ? যত্তো সব …। এটাই বোধহয় ধর্মের ধান্ধাবাজী। “সমাজের শত্রুতা”।
অনেক সময় নষ্ট হলো। এর চেয়ে বিজ্ঞান নিয়ে আলোচনা করলে বেশি ভালো হতো । ওতে সত্যি কথাটা জানা যায়। বিজ্ঞান বলছে, পরিষ্কার ভাষায়, শুরুতে কিসস্যু ছিলোনা। সব ছিলো ফাঁকা। না , ভুল বললাম, ফাঁকাও ছিলো না ।ফাঁকা জায়গাতে তো তবু হাওয়া থাকে। তাও ছিলো না। ওই ‘খালি’ জায়গাটার নাম দেওয়া যাক ‘স্পেস্’। সেই স্পেসে ভগবান জানেন কীভাবে… সরি ,… কেউ জানেনা কীভাবে, তৈরি হলো ‘শক্তি’!! মানে, জন্মালো সেই ‘এনার্জী ‘। সেই এনার্জিকে কেউ নাকি তৈরি করতে পারে না। এনার্জী ক্রিয়েট্স্ এনার্জী। সে নিজেই নিজেকে তৈরি করেছে। এর ক্ষয়ও নাকি নেই, মানে, ‘মৃত্যু’ও নেই।
যা – চ্চলে ! এ তো দেখছি একই কথা বলতে শুরু করলো। সনাতন হিন্দু ধর্মের ওই একদম এক কথা !!! ভারী ভারী সব আলোচনা। মাথায় ঢুকতে চায় না। কষ্ট হয়। এর থেকে বাবা ওই ঈশ্বর ফিশ্বর নিয়ে কথা না বাড়িয়ে সোজা বলে দাও, “তোমাদের বুঝতে হবেনা। বোঝার ব্যাপারটা তোমরা তোমাদের পাড়ার মাথাদের ওপর ছেড়ে দাও। সে বুঝে নিয়ে তোমাকে বলে দেবে কি করতে হবে। কবে কি করতে হবে ।জমায়েত,ভাঙচূর করতে হবে। তার কথা শুনে চললেই তোমার জন্ম সার্থক। সনাতনী হিন্দুরা তখন বোকার মতো বললো, "তাও মাথায় ঢুকছে না স্যার ।' অ-আ-ক-খ'- ই যদি বুঝতে না পারলাম, তাহলে পরে সাহিত্য-কর্মটা বুঝবো কি করে? সহজ ভাষায় আমাদের বুঝিয়ে দিন, গল্পের মতো করে। আমরা ঠিক বুঝে, মনে রাখবো।" """""”""""""""""""""""""""""" আমার মনে হয় আমাদের পুরো সনাতনী হিন্দু ধর্মটাই সেজন্য নানা রকম গল্পের মাধ্যমে, মনোবৈজ্ঞানিক কাউন্সিলিং-এর মতো করে , মনে করিয়ে রাখার জন্য, সাজিয়ে গুছিয়ে রসিয়ে বড় বড় পণ্ডিতেরা তৈরি করে রেখেছেন। বৌদ্ধ ধর্মের 'জাতক'ও ঠিক তাই। বৌদ্ধ-ধর্মে বুদ্ধদেবের মূর্তি গড়া বারণ। খৃষ্টধর্মেও ওই একই ব্যাপার।। যীশু খৃষ্টের মূর্তি গড়া বা ছবি আঁকা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। কিন্তু মানুষের আবেগ কি আর বাঁধ মানে? কতো ছবি, কতো চেহারার মূর্তি বাজারে, ক্যালেণ্ডারে আঁকা হচ্ছে। যে যার নিজের ভালোবাসা দিয়ে রাঙাচ্ছে, মুর্তি গড়ছে। যে যার নিজের সংস্কৃতি অনুযায়ী সাজাচ্ছে। চিনের লাফিং বুদ্ধও বানাচ্ছে, চিনের পেটমোটা বয়স্ক মানুষদের মতো। গ্রিক দেবতার মতো হয়েছেন গান্ধার শিল্পে। মধ্যপ্রাচ্যের আরমাইকভাষী মানুষ হয়েও বাংলার 'ঈশাইনাথ' বা যীশুখৃষ্টের চুল হয়েছে সোণালী আর চোখের মণির রং হয়েছে অ্যামেরিকানদের মতো নীল!!! সবই কাল্পনিক, কেউই স্বচক্ষে দেখেন নি । প্রথম বুদ্ধমুর্তি তৈরি হয় তাঁর তিরোধানের ছ-শো বছর পরে। সুতরাং আসল চেহারাটা দেখবে কে ? একই ভাবে, প্রথম যীশুখৃষ্টের ছবি আঁকা হয়, সেন্ট কল্লিস্টো শ্যাফেলে, তাঁর ক্রুসিফিকেশনের পা্ঁচ-শো বছর পর। মানে শিল্পীরা কল্পনা করে এঁকেছেন বা বানিয়েছেন। আসল চেহারাটা কি, তাঁরা কেউই জানেন নি। যে যার মতো ভালোবেসে সাজানো, রাঙানোর ব্যাপার। সেজন্যই সরল মনে বাংলার মা-দূর্গা হয়েছেন 'ঘরের মেয়ে'। মুখে সন্দেশ গুঁজে, চোখের জল ফেলে, জীবন-মরণকে এক সঙ্গে রেখে , জেনে শুনেই মাটির তৈরি নিষ্প্রাণ পুতুলটাকে বলি, "এসো মা, আবার এসো"। দেবী দূর্গা হয়ে যান, বাড়ির মেয়ে উমা। বাইবেলেও লেখা আছে, ঈশ্বর নাকি নিজের চেহারারই অনুকরণে তৈরি করেন আদমকে। ঈভকে তৈরি করেন আদমের বুকের পাঁজরা দিয়ে, প্রেমের চূড়ান্ত এক মাখামাখি নিদর্শন হিসেবে। ঈশ্বর-মানুষ জড়িয়ে একাত্ম হয়ে গেছেন। এমনটা কোথাও দেখিনি। *****। ******। ******* আজকের এই 'প্রলাপে', আমি তেমনি এক গল্প আপনাদের শোনাবো। আগে হয়তো অনেকেই শুনে থাকবেন। তবুও শুনুন , ভালো লাগবে। নারায়ণের নাকি দুটো স্ত্রী। লক্ষ্মী এবং অলক্ষ্মী। দুজনেই ফাটাফাটি সুন্দরী। দুজনেই যে যাঁর মতো তাঁদের লাইনে চূড়ান্ত পারদর্শীনী । কিন্তু , বুঝতেই পারছেন, দুজনের মধ্যে চুলো-চুলি, খুন্তি-তুলি নিয়ে সোর্ড্ ফাইট, ব্লাউজের কাটিং নিয়ে, হাটা-চলার কায়দা নিয়ে ফ্লাইং রিমার্ক্স্ লেগেই থাকতো। সতীন বলে কথা। লিপ-স্টিকের রং নকল করা, "স্বামীর সামনে বেশী ঢং আর ঢলানী",ইত্যাদিকে কেন্দ্র করে ডেসিবল্ ভাঙ্গার কারণে কাক চিল তো বটেই, বেচারা নিরীহ বৃদ্ধ গড়ুর মশাই পর্য্যন্ত, কথা দেওয়া সত্ত্বেও, অ্যান্টেনায় বসতে পারতেন না।

নারায়ণ চালু পার্টি। সাতেও নেই পাঁচেও নেই। কিন্তু সাত+ পাঁচ =বারোতে আছেন। সুদর্শন চক্রটাতে লেদ-মেশিনের কাটিং অয়েল লাগিয়ে রোদে শুকোতে দিয়ে, নিজে বাসুকীর ফণার ছায়ায় কুণ্ডলীর ওয়াটার বেডে শুয়ে দিব্যি বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। সেই আয়েসে ছন্দপতন ঘটিয়ে লক্ষ্মী-অলক্ষ্মীর সশব্দে প্রবেশ। নারায়ণের ঘুম চটকে রায়। লক্ষ্মীতো এমন দুম্-দাম্ আওয়াজ করে আসেন না। কেশ তাহলে নিশ্চয়ই স্যুটকেশ ! হ্যাঁ, ঠিক তাই। বাপের বাড়ি চলে যাবার বন্দোবস্ত করেই এসেছেন। আর অলক্ষ্মীও উবের ডাকার জন্য মোবাইল নিয়ে প্রস্তুত! হাতে বিউটি কেস। !!
নারায়ণ নকল অবাক হয়ে বললেন,” প্রিয়তমা আর প্রাণহরা, কোথায় চললে? নতুন কোনো বুটিক উদ্বোধনে চললে বুঝি? দারুণ সেজেছো।”
— ন্যাকামি করো না। আড়ালে আমাদের মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে এড়িয়ে যাওয়াটা তোমার অভ্যাস হয়ে গেছে। দেখাচ্ছি মজা। আমরা বুঝিনা ? আজকে এর একটা হেস্ত-নেস্ত করিয়েই ছাড়বো। “
নারায়ণকে ওঁরা কথা বলতেই দিচ্ছেন না।
–“ঠিক আছে, ঠিক আছে, বলো কী আদেশ ?”
–” আপনাকে আজ ঝেড়ে কেশে বলতেই হবে…আমাদের মধ্যে কে সেরা?? সব দিক দিয়ে, সব গুণ দিয়ে মেপে।” দুজনে প্রায় সমস্বরেই বললেন।

নারায়ণ পড়লেন বিপাকে। বাসুকীর দিকে তাকাতেই সে পাঁচটা মাথাই ঘষাঘষি করে চুলকোতে শুরু করেন।
কিন্তু নারায়ণ ইজ নারায়ণ। কনফুশিয়াসকে কনফিউজ্ড্ করে দেবার পার্টি। নারদা কান্ডের প্ল্যানার !
বললেন-” এই ব্যাপার!!?? আমিও আজ কয়েকদিন হলো ব্যাপারটা নিয়ে ভেবেছি। যাই হোক, তোমরা যখন নিজের থেকেই এসেছো, তখন ব্যাপারটা একটু সহজ-ই হয়ে গেল। জানো তো, দুনিয়াটা পাল্টে গেছে। এসব আন্তরিক কাজের পদ্ধতিও পাল্টেছে। তোমাদের সেজে গুজে, Ramp-এ হাঁটতে হবে।
— Ramp-এ ?
— হ্যাঁ, তবে বেশি দূর নয়। ইচ্ছে মতো সেজে, হেটে ওই চন্দন গাছটা পর্যন্ত গিয়ে, ছুঁয়ে আবার এখানে আমার কাছে ফিরে আসতে হবে। নিজেদের মতো করেই হাঁটবে….. আমি যা দেখার, দেখে নেবো।

দুজনেই কোমরে আঁচল জড়িয়ে প্রস্তুত হলেন।
—স্টার্ট্ !
দুজনেই নিজেদের মতো হেঁটে নারায়ণের সামনে এসে দাড়িয়ে বলেন– ” কী ? রেজাল্ট্ বলো, এক্ষুনি। সময় নষ্ট করা চলবে না

নারায়ণ বললেন, ” বলবো তো বটেই। একদম অন্তর থেকে সত্যি কথাটাই বলবো। কিন্তু তোমাদেরও কথা দিতে হবে, তোমরা সেটা মেনে নেবে, …এই নিয়ে আর বিবাদ করবে না!!”
দুজনেই কথা দেন।
নারায়ণ বলেন, “তোমরা দুজনেই অতুলনীয়া। দুটো ব্যাপারে। প্রথমে অলক্ষ্মী, তুমি তখন যাচ্ছিলে, আহা, কি তাঁর রূপ,কি তাঁর সুন্দর আনন্দের ছটা, কি ভালোই না লাগছিলো!!! সেখানে লক্ষ্মী,তুমি হেরে গেছো। খু–ব খারাপ লাগছিলো তোমার যাওয়াটা। কেউ পছন্দ করেনি, করবে না।
কিন্তু লক্ষ্মী!! তুমি যখন ফিরে আসছিলে!! কি অপরূপ তাঁর রূপ, কি তাঁর আনন্দ উল্লাস, সুখ- শান্তি-তৃপ্তি, আরও বেঁচে থাকার ইচ্ছে…সেখানে অলক্ষ্মী তুমি একদম হেরে গেছো। দুজনেই দুর্দান্ত ভালো। একজন যাওয়ায়, আর একজন আসায়।
দুজনেই দুটো ফার্স্ট-প্রাইজ নিয়ে সুখে বসবাস করতে লাগলেন। গড়ুর আবার অ্যান্টেনায় আবার ফিরে এসে বসেন।

হিন্দু ধর্মের গল্প , অমৃত-সমান,
প্রদীপ সরকার ভণে, শুনে পূণ্যবান।।

Be First to Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.