Press "Enter" to skip to content

কৃষ্ণচন্দ্র দে মূলত ক্লাসিক্যাল শিল্পী হলেও জনপ্রিয় কীর্তনীয়া ছিলেন তিনি। সেই সময় অসংখ্য কীর্তন বা কীর্তন অঙ্গের গান গেয়েছেন, লিখেছেন এবং সুরও করেছেন………

জন্মদিনে স্মরণঃ কৃষ্ণচন্দ্র দে (কানা কেষ্ট)

বাবলু ভট্টাচার্য : বিখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ কৃষ্ণচন্দ্র দে, যিনি দৃষ্টিহীন হয়েও নিজের মেধা ও দক্ষতার গুণে ভারতীয় সঙ্গীত জগতে নিজেকে দাঁড় করিয়েছিলেন এক অনন্য উচ্চতায়। সঙ্গীত পরিবারে জন্ম না হলেও ভালোবাসা থেকেই সঙ্গীতের নিজস্ব ঘরানায় তৈরি করেছিলেন আপন ভুবন। শৈশব থেকেই সঙ্গীতের প্রতি অগাধ ভালবাসা এবং নিষ্ঠা দেখে শশীভূষণ চট্টোপাধ্যায় তাঁকে গান শেখাবার আগ্রহ প্রকাশ করেন। সেই থেকে শুরু সঙ্গীত শিক্ষার। ক্রমান্বয়ে তিনি উস্তাদ বাদল খানের কাছে খেয়াল, দানী বাবুর কাছে ধ্রুপদ, রাধা রমণের কাছে কীর্তন ও কণ্ঠে মহারাজের কাছে তবলা শেখেন। ১৯১৭ সালে গ্রামোফোন কোম্পানি তার প্রথম রেকর্ড বের করে। এরপর আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। সঙ্গীতের প্রতিটি ক্ষেত্রে অবাধ বিচরণ তার। মূলত ক্লাসিক্যাল শিল্পী হলেও জনপ্রিয় কীর্তনীয়া ছিলেন তিনি। সেই সময় অসংখ্য কীর্তন বা কীর্তন অঙ্গের গান গেয়েছেন, লিখেছেন এবং সুরও করেছেন। ‘স্বপন যদি মধুর এমন’, ‘তোমার কাজল আঁখি’, ‘তুমি গো বহ্নি শিখা’, ‘মুক্তির মন্দির সোপান তলে কত প্রাণ হল বলিদান’—- এমন বহু কালজয়ী গান আজও লোকমুখে শোনা যায়। অন্যান্য গানগুলোও লোকসঙ্গীত আশ্রিত হওয়ায়, সহজেই শ্রোতার হৃদয় ছুঁয়ে যায়।

কীর্তন, বাউল ও ভাটিয়ালী গানগুলোর পাশাপাশি তার গাওয়া হিন্দী, উর্দু, গজলও জনপ্রিয় হয়ে উঠে। তার হাত ধরেই বাংলা গানে ঠুমরী, দাদরা ও গজলের প্রচলন হয়। গান বাছাইয়ের ক্ষেত্রে তিনি বেশ যত্নশীল ছিলেন। বেশির ভাগই বিখ্যাত কবি হেমেন্দ্র কুমার রায়, শৈলেন রায়, অজয় ভট্টাচার্য প্রমুখের লেখা গানকে নিজেই সুর দিতেন। দৃষ্টিহীন হয়েও অসম্ভব দক্ষতায় সংস্কৃতির বিভিন্ন শাখায় বিচরণ শুরু করেন। সঙ্গীত পরিচালনার পাশাপাশি সুনিপুণভাবে মঞ্চ ও সিনেমাতে সমান দাপটে অভিনয় করেছেন। অভিনয়ের ক্ষেত্রে দৃষ্টিহীনতা বাধা সৃষ্টি করতে পারেনি কখনোই।অপর প্রবাদপুরুষ শিশির ভাদুড়ির থিয়েটারে একের পর এক নাটক সফল হতে থাকে কৃষ্ণচন্দ্রের সঙ্গীত ও অভিনয় গুণে। এরপরে বাংলা থিয়েটারের উন্নতি সাধনের লক্ষ্যে ১৯৩১ সালে কৃষ্ণচন্দ্র নিজেই থিয়েটার কোম্পানি খোলেন। শিশির ভাদুড়িও অভিনয় করেছিলেন তার নতুন থিয়েটারে।

সেই সময়ে থিয়েটার নিয়ে দারুণ ব্যস্ত তিনি। এরই মাঝে প্রস্তাব আসে চলচ্চিত্র জগত থেকে। অনিচ্ছাসত্ত্বেও প্রথম ‘টকি সিনেমা’য় দুটি গানে কণ্ঠ দেন ১৯৩১ সালে। পরের বছর ১৯৩২ সালে নির্মিত ‘চণ্ডীদাস’ চলচ্চিত্রে নাম ভুমিকায় অভিনয় ও কণ্ঠদান দুই-ই সাফল্যের সাথে করেন।কলকাতার সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকাকালীন কৃষ্ণচন্দ্র দে ১৯৪২ সালে মুম্বাই পাড়ি জমান। দৃষ্টিহীন ছিলেন তাই সহযোগী হিসাবে সার্বক্ষণিক সঙ্গী ছিল তার ভ্রাতুষ্পুত্র, পরবর্তীকালের আরেক কিংবদন্তী হয়ে ওঠা সঙ্গীতশিল্পী মান্না দে। যিনি ছিলেন কাকার যোগ্য সহযোগি শিষ্য। যে মান্না দে আজ ভারতের সঙ্গীতাঙ্গনের কিংবদন্তী শিল্পী, তিনি এই দৃষ্টিহীন কাকা কৃষ্ণচন্দ্র দে’র হাতেই তৈরি। কাকার হাত ধরেই প্লে-ব্যাক সিঙ্গার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। অপর কিংবদন্তী শচীন দেব বর্মন-এর সঙ্গীতে হাতে খড়িও কৃষ্ণচন্দ্র দে’র হাতেই।মুম্বাইতে অভিনয়ের পাশাপাশি তৎকালীন সময়ের হিন্দি ছবির অসংখ্য জনপ্রিয় গানের সুরারোপ, সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন তিনি। জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী মোঃ রফি, মুকেশ এবং কিশোর কুমার সহ অনেকেই গেয়েছেন সে সব গান। তবে সবচেয়ে বেশি গেয়েছেন মোঃ রফি। মুম্বাইয়ের সিনেমা জগতে তিনি পরিচিত কে.সি. দে নামে।

১৯৪৭ সালে বাংলা চলচ্চিত্র জগতে ফিরে এসে শুরু করেন চলচ্চিত্র প্রযোজনা। পরপর বেশ কয়েকটি সফল সিনেমার পর, ১৯৫৭ সালে ‘একতারা’ সিনেমায় অতিথি শিল্পী হিসাবে জীবনে শেষবারের মতো পর্দায় আবির্ভূত হন কৃষ্ণচন্দ্র।

১৯৬২ সালের নভেম্বরে ৬৯ বছর বয়সে কলকাতায় বসবাসকালীন অবস্থায় পরলোকগমনের মধ্য দিয়েই বাংলা সঙ্গীতের এক আদি পর্বের অবসান ঘটে।

কৃষ্ণচন্দ্র দে ১৮৯৩ সালের আজকের দিনে (২৪ আগস্ট) কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন।

More from GeneralMore posts in General »

Be First to Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.