Press "Enter" to skip to content

অমর বোস এর সামান্য ক্ষোভ থেকেই জন্ম নিল শব্দের দুনিয়ায় সারা জাগানো নাম “বোস কর্প”…….।

জন্মদিনে স্মরণঃ অমর বোস

বাবলু ভট্টাচার্য : ইলেট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডক্টরেট করার পর আনন্দে একখানা ডিলাক্স স্টিরিওই কিনে ফেললেন। সময়ের হিসেবে (১৯৫৬) দামটা অবশ্য একটু বেশি পড়েছিল। কিন্তু সদ্য পিএইচডি করা ছাত্রটি দাম নিয়ে ভাবেননি। কিন্তু স্টিরিও হাতে মহানন্দে বাড়িতে ফিরেই মেজাজ গেল বিগড়ে। চড়া দামে কেনা ডিলাক্স স্টিরিওর শব্দ এমন ভজঘট হবে কেন! সামান্য ক্ষোভ— আর তাতেই আমূল বদলে গেল সাউন্ড সিস্টেমের সংজ্ঞা। তথাকথিত ‘হাই এন্ড অডিও প্রডাক্ট’-এ যুগান্তকারী পরিবর্তন আনা ‘বোস কর্প’ তৈরি হয়েছিল অমর বোস নামক ইলেট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সেই জনৈক পিএইচডি ছাত্রর ক্ষোভ থেকেই। ১৯৬৪ সাল। বোস্টন লাগোয়া ফ্র্যামিংহ্যামে এক বাঙালি বাবুর তত্ত্বাবধানে বদলাতে শুরু করল ধ্বনিবিজ্ঞানের ইতিহাস। প্রতিষ্ঠিত হল ‘বোস কর্প’। তারপর পাঁচ দশক ধরে বিবর্তনের অবিরাম ধারা। আমৃত্যু আমেরিকার বাসিন্দা, কিন্তু বিশ্ব-বাণিজ্যে বাঙালির সবচেয়ে বড় গ্লোবাল মুখ ছিলেন তিনিই।

১৯৬৪-৬৫ সাল। সাউন্ড সিস্টেম নিয়ে বিশেষ খুশি ছিলেন না ‘নাসা’র বিজ্ঞানীরা। বোস কর্প-এর আবির্ভাবে যেন তারা পেলেন সমাধান সূত্র। ডাক পড়ল অমর বোসের। সংস্থার প্রথম বরাতটি এল মার্কিন মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্র থেকেই। রাতারাতি বদলে গিয়েছিল ‘নাসা’র সাউন্ড সিস্টেম। সেই শুরু। এরপর বাণিজ্যিক উৎপাদনের পালা। মানুষের শ্রবণ-অভ্যাসে বিপ্লব আনল ‘বোস কর্প’-এর নতুন স্পিকার।
একের পর এক আবিষ্কার, একাধিক পেটেন্ট— অমর বোসের নেতৃত্বে শব্দবিজ্ঞানের যুগ দেখল নতুন অধ্যায়। অমর গোপাল বসুর বাবা একজন বাঙালি এবং মা শ্বেতাঙ্গ আমেরিকান। তার বাবা ননী গোপাল বসু ছিলেন একজন ব্রিটিশ বিরোধী বাঙালি বিপ্লবী। তিনি তার রাজনৈতিক কর্মকান্ডের জন্য কয়েকবার কারাবন্দীও হন। তাই ব্রিটিশ উপনিবেশ পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার এড়াতে ১৯২০ সালে তিনি কলকাতা থেকে পালিয়ে যুক্তরাষ্ট্র চলে যান। অমর বসু মাত্র তের বছর বয়সেই তার উদ্যোক্তা প্রতিভার পরিচয় দেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন এ সময়ে পরিবারের জন্য বাড়তি আয়ের যোগান দিতে তিনি তার স্কুলের বন্ধুদের নিয়ে মডেল ট্রেন ও হোম রেডিও মেরামতের একটি ছোট পারিবারিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠা করেন।

পেনসিলভানিয়ার অ্যাবিংটনে অবস্থিত অ্যাবিংটন সিনিয়র হাইস্কুল থেকে স্নাতক সম্পন্ন করার পর বোস ম্যাসাচুসেটস ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজিতে ভর্তি হন এবং ১৯৫০ সালের শুরুর দিকে সেখান থেকে ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এ বিএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন অমর বোস। পরবর্তীতে তিনি ফুলব্রাইট রিসার্চ স্টুডেন্ট হিসাবে দিল্লিতে এক বছর কাটান। তিনি এমআইটি থেকে ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এ পিএইচডি সম্পন্ন করেন। সাফল্যের শিখর স্পর্শ করলেও, সদ্য ছাত্রাবস্থা কাটিয়ে কেনা সেই স্টিরিওর বিরক্তিকর শব্দটা জ্বালিয়ে চলেছিল ক্রমাগত। ঘটল আধুনিক শব্দবিজ্ঞানের সম্ভবত সবচেয়ে বড় আবিষ্কার— ‘নয়েজ রিডাকশন’। বাজারে এলো বোস কর্প-এর হেডসেট। অমর বোসের উদ্ভাবনী ক্ষমতার আর এক পরিচয় আজও বহন করছে গাড়ির মিউজিক সিস্টেম। ‘ভালো যন্ত্র মানেই বড় যন্ত্র’— সমূলে উৎপাটিত হল শব্দবিজ্ঞানের প্রচলিত এই ধারা। বোস কর্প-এর ছোট সাউন্ড সিস্টেমে গমগম করে উঠল বিশাল অডিটোরিয়াম।

অমর গোপাল বোস ১৯২৯ সালের আজকের দিনে (২ নভে) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া অঙ্গরাজ্যের ফিলাডেলফিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন।

Be First to Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.