হারানো দিনের কথামালা………

প্রবীর রায় : বিশিষ্ট অভিনেতা, প্রযোজক ও পরিচালক। ২ আগস্ট, ২০২০। যাক এবার ‘বিচিত্র তদন্ত”র কথায় আসা যাক। জমা দেওয়ার এক মাসের মধ্যে approval letter পেয়ে গেলাম। Infocom এর রবীনদার সঙ্গে কথা হলো……ওনাদের ক্যামেরা আর টেকনিকাল assistance এর ব্যাপারে সব ফাইনাল হলো । কিন্তু ডিরেক্টর তখন ফাইনাল হয়নি। সেই সময়ে ইন্দর সেন (চাঁদুদা) Infocom এর ‘সম্পর্ক” ধারাবাহিকের কয়েকটা এপিসোড এর direction দিয়েছেন……আমার সঙ্গে খুব ভালো পরিচয় ছিল ওনার “পিকনিক” ছবির shoot এর সময় থেকে । বেশ কয়েকটা হিট ফিল্ম এর ডিরেক্টর ইন্দর সেন “প্রথম কদম ফুল”, “পিকনিক”, “অর্জুন” “অসময়” ইত্যাদি । ‘অসময়’ তো ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ডও পেয়েছিলো ।

সেই চাঁদুদাকে শেষ পর্যন্ত ডিরেক্টর করা হলো। খুব স্ট্রিক্ট প্রিন্সিপলের লোক…..টাইম মেইনটেইন করতেন খুব। যে কোনো প্রোডিউসারের কাছে অ্যাসেট। আদ্যন্ত ভদ্রলোক। এবার কাস্ট। শার্লক হোমস (ধারাবাহিকে নাম দেওয়া হয়েছিল “ঘন্যশ্যাম নন্দী”) এর চরিত্রে রবীনদার পরামর্শ মতো “ন্যাশনাল স্কুল অফ ড্রামার (NSD )” র জয়ন্ত দাসকে নেওয়া হলো । জয়ন্ত দিল্লির ছেলে, তখন হিন্দি “Police Files ” এর main character করছে। আর এক আদ্যন্ত ভদ্রলোক। আর ওর অ্যাসিস্ট্যান্ট Dr Watson (নাম দেওয়া হয়েছিল অবিনাশ) এর চরিত্রে নেওয়া হলো রমেন রায়চৌধুরীকে।

সংগীত পরিচালক নেওয়া হলো চন্দন রায়চৌধুরীকে। চন্দনের বোধহয় প্রথম সংগীত পরিচালনা। ঠিক খেয়াল নেই । ভুলও হতে পারে আমার। কলকাতা দূরদর্শনের প্রথম ডিটেক্টিভ ধারাবাহিক। ন্যাশনালে তখন চলছে পঙ্কজ কাপুরের “করমচাঁদ”। আমাদের শুটিং শুরু হলো প্রিন্স আনোয়ার শাহ রোড এ নিউ থিয়েটার্স ২নং.এ (পরবর্তীকালে যেটা টেকনিসিয়ান্স ২নং বলে পরিচিত হয়)। পাইলট এপিসোড হয়ে গেলো….approve ও হয়ে গেলো। এবার ২,৩,৪ এর শুটিং শুরু হলো। এই সময় একদিন রমেন একটি মেয়েকে নিয়ে এলো, অভিনয় করতে চায় ….টালিগঞ্জ অশোকনগরে থাকে। কলেজে পড়ে তখন। সালটা বোধহয় ১৯৮৬ । দুটো এপিসোডের জন্য ওকে সিলেক্ট করা হলো । সেই মেয়েটির নাম “রুপা গাঙ্গুলী”। ও তখন আরেকটা টেলিফিল্মের shoot করছিলো ।

পরিচালক ছিলেন বিজয় চ্যাটার্জী। তবে আমাদের “বিচিত্র তদন্ত” প্রথম টেলিকাস্ট হয় । সেই ক্ষেত্রে রুপার প্রথম স্ক্রিন এপিয়ারেন্স আমাদেরটাই বলা যায় । শার্লক হোমসের একটা বিখ্যাত গল্প ছিল “Scandal in Bohemia “। সেই গল্পটার জন্য একজন খুব সুন্দরী নায়িকার দরকার ছিল । কাকে নেওয়া যায় ….চাঁদুদা বললো , ideal for this character will be Moon moon sen । তখন মুনমুনের সঙ্গে পরিচয় নেই । একটা এপিসোড ও কি করবে…তারপর ওর সম্বন্ধে শুনেছি , ও খুব whimsical , যখন তখন ফ্লোর ছেড়ে চলে যায় ইত্যাদি ইত্যাদি । একদিন আমি আর চাঁদুদা মুনমুনের বাড়ি চলে গেলাম Harrington Mansion এ। সব বলার পর..ও রাজি হয় গেলো mainly ইন্দর সেনের সঙ্গে কাজ করবে বলে। তখন চাঁদুদা বললো , দেখুন আপনি কিন্তু যখন তখন ফ্লোর ছেড়ে বেরিয়ে যেতে পারবেন না….আমাদের সময় অনুযায়ী আপনাকে সময় দিতে হবে….যদি এগুলো সম্ভব হয় তবেই রাজি হন, otherwise lets be good friends । মুনমুন বললো আমি সব রাজি । এবং সত্যি সত্যি she was really outstanding। এর পরেও ওর সঙ্গে আরো অনেক কাজ করেছি, ওর কোনো তুলনাই হয় না । আর এই গল্পে মুনমুনের opposite এ অভিনয় করলাম আমি। মুনমুনের প্রথম টিভি সিরিয়াল এপিয়ারেন্স । মুনমুন সেন , রুপা গাঙ্গুলী ছাড়াও আরো দুজন নাট্যব্যাক্তিত্ব প্রথম ক্যামেরার সামনে আসেন এই ধারাবাহিকে । মেঘনাদ ভট্টাচার্য্য আর থিয়েটার ওয়ার্কশপের অশোক মুখোপাধ্যায়।

“বিচিত্র তদন্ত”র আরো ৩ টে এপিসোড জমা পরে গেলো….telecast date আর time পেয়ে গেলাম ।।এই সময়ে কলকাতায় “Soviet Circus ” এসেছে অনেক বছর পর …নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে । কলকাতায় সবার খুব উৎসাহ রাশিয়ান সার্কাস দেখবে। সেটার কভারেজ আর টেলিকাস্ট রাইটস আমার কাছে চলে এলো । আবার ৪ ক্যামেরা অনলাইন কভার করলাম কিন্তু টেলিকাস্ট করবো কি করে। কোনো telecast ডেট খালি নেই….আমি তখন সলিলদা আর বিদ্যুৎদা (B K Saha , ডেপুটি ডিরেক্টর ) কে বললাম ..আমার “বিচিত্র তদন্ত” ৪ সপ্তাহ পিছিয়ে দিন । ওখানে “সোভিয়েট সার্কাস” নিয়ে আসি ।ওনারা রাজি হয়ে গেলেন ।

সোভিয়েট সার্কাস টেলিকাস্ট ডেট পেয়ে গেলাম । কিন্তু স্পনসর ? হাতে মাত্র ৩ দিন সময় আছে । চলে গেলাম O.B.M ( এখন যেটা O & M) এর ব্রাঞ্চ ম্যানেজার সুমিত রায় এর কাছে । বললাম একটা ব্যবস্থা করতেই হবে । সুমিত রায় দুদিনের মধ্যে স্পনসর ব্যাবস্থা করে দিলেন “Calcutta Chemical ” । ৪ সপ্তাহের পর আরো ২ সপ্তাহ এক্সটেনশন নিয়ে ৬ এপিসোডের ধারাবাহিক হলো সোভিয়েট_সার্কাস । সোভিয়েট_সার্কাস শেষ হয়ে যাওয়ার পর বিচিত্র তদন্ত টেলিকাস্ট শুরু হলো। ইন্দর সেন একটা অসাধারণ টাইটেল করেছিলেন । তখন কিন্তু গ্রাফিক্সের কোনো কাজ হতো না। কিন্তু আমাদের এর টাইটেল দেখে সবাই ভাবতো কি করে এই টাইটেল করা সম্ভব । তার সঙ্গে চন্দনের দারুন music ধারাবাহিকটাকে এক অন্য লেভেলে নিয়ে গিয়েছিল। তখন National এ “করমচাদ” হিট ধারাবাহিক ছিল কিন্তু ওয়েস্ট বেঙ্গলে বিচিত্র তদন্ত- র TRP “করমচাঁদ” কে ছাড়িয়ে গিয়েছিলো।

“বিচিত্র তদন্ত” শেষ হওয়ার আগেই আমি শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের গৃহদাহ- র স্ক্রিপ্ট জমা দিয়েছিলাম। কলকাতা দূরদর্শনে শরৎচন্দ্রর উপন্যাস প্রথম ! তখন কিন্তু রাইট কিনতে হত । পূর্ণদাস রোডে মনিকা দেবীর কাছ থেকে ৩০,০০০/- টাকায় রাইট কিনেছিলাম । ডিরেক্টর হিসেবে নিয়েছিলাম সুজিত গুপ্তকে। সুজিত তখন “সম্পর্ক” র বেশ কয়েকটা গল্প ডাইরেক্ট করেছে।কলকাতা দূরদর্শনে প্রথম গোয়েন্দা ধারাবাহিক শেষ হলো অসম্ভব ভালো TRP (টেলিভশন রেটিং পয়েন্ট) নিয়ে। 24 Frames এর বেশ নাম হয়ে গেলো। “Ravishankar — A Legend of Glory “, “Soviet Circus ” আর “বিচিত্র তদন্ত” শেষ হলো । শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের “গৃহদাহ” approval এর পথে। কিন্তু আমার তো কোনো কিছুই সহজে হয় না। তাই আবার বাধা….লোকের ভালো করতে গিয়ে নিজে বাঁশ নেওয়া। আগেই বলেছি সুজিত গুপ্তকে পরিচালক ঠিক করেছিলাম । চিত্রনাট্য অরূপ রতন বসুর । যিনি পরবর্তীকালে ETV র script approval (টেলি ফিল্মস) department এর Head হয়ে কাজ করেন । আজ আর অরূপদা নেই…..সুজিতও নেই।

যে কথা বলছিলাম ….দূরদর্শনে পেপার সাবমিট করার সময় পরিচালকের নাম দিতে হয় এবং অনুমোদন হয়ে যাওয়ার পর আর পরিচালক পরিবর্তন করা সম্ভব হয় না , যদি না পরিচালক নিজে “No Objection Certificate ” (NOC ) দিয়ে দেয় যে ওর পক্ষে কাজ করা সম্ভব না, অন্য যে কেউ পরিচালনা করতে পারবেন, ওর কোনো আপত্তি নেই । “গৃহদাহ” approve হওয়ার পর , সুজিত বলা শুরু করলো “অচলা”র চরিত্রে সায়নী মিত্র অভিনয় করবে। আমি বললাম, অসম্ভব । মৃনালের চরিত্রে সায়নীকে ভাবা যেতে পারে কিন্তু “অচলা” যে ধরনের সুন্দরী, তাতে এই মুহূর্তে মুনমুন ছাড়া আর কাউকে ভাবা যায় না। তারপর “অচলা” তখনকার সময়ের ব্রাহ্ম বিদুষী মহিলা…..যেটা মুনমুনের মধ্যে ভীষণ ভাবে বর্তমান….ওই চরিত্রে আমি মুনমুন ছাড়া কাউকে ভাবতে পারছি না । একজন অসম্ভব ব্রাহ্ম বিদ্বেষী “সুরেশ” “অচলার” সৌন্দর্যে ব্রাহ্ম বিদ্বেষ ভুলে গিয়ে “অচলা’র প্রেমে পড়ে গেলো । আমি কিছুতেই মুনমুন ছাড়া কাউকে ওই চরিত্রে ভাবতে পারছি না ।

কিন্তু সুজিত কিছুতেই মানবে না …..”গৃহদাহ” তখন বন্ধ হয়ে যাওয়ার মুখে । কারণ ডিরেক্টর চেঞ্জ করা যাবে না। বাধ্য হয়ে আমি ফেডারেশনে complain করলাম….তখন ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট ছিলেন অজিত লাহিড়ী আর সেক্রেটারি ছিলেন প্রণব চৌধুরী (বাবলু ) । বুবুও (শমিত ভঞ্জ) তখন বেশ active ফেডারেশনে। যাইহোক ওখানে আমার case উঠলো এবং সবাই আমার favour এ। শেষে সুজিতকে বোধহয় ১৫,০০০/- দিয়ে ওর কাছ থেকে NOC নিলাম। ফেডারেশনের ডিসিশনে । আমি স্বস্তির নিশ্বাস ফেললাম । আবার গেলাম ইন্দর সেনের কাছে….ভদ্রলোক এবং capable ডিরেক্টর। চাঁদুদা (ইন্দর সেন) কে নেওয়ার অ্যাডভান্টেজ ছিল , ওনাকে সবাই খুব শ্রদ্ধা করতো আর ভয়ও পেত । আগেই বলেছি ভীষণ disciplined। চাঁদুদার বাড়িতে বসে cast ঠিক করলাম। “মহিম” ভাবলাম রঞ্জিত মল্লিককে ….”অচলা” মুনমুনকে, “মৃনাল” পাপিয়া অধিকারীকে । “সুরেশ” আমরা ভাবলাম বেনু (সব্যসাচী) কে। বেনুর ব্যাপারে তখন ফাইনাল ডিসিশন দিতেন জোছনদা (জোছন দস্তিদার)। চাঁদুদার বাড়ি থেকেই ফোন করলাম জোছনদাকে। জোছনদা রাজি হলেন না। দুদিন পরে অবশ্য বেনু নিজে ফোন করে interest দেখিয়েছিলো কিন্তু তখন আমরা বুবু (শমিত ভঞ্জ) কে ফাইনাল করে ফেলেছি ।

এবার আমাদের সমস্যা শুরু হলো মুনমুনকে নিয়ে…..ও কিছুতেই “অচলা” করবে না কারণ যে চরিত্র মা করেছেন, সেই চরিত্র করার সাহস ওর নেই । তখন মুনমুনের সঙ্গে আমাদের খুব বন্ধুত্ব ..যে বন্ধুত্ব এখনো একই রকম আছে। মুনমুন এর husband , ভরত দেববর্মনও বলছেন ওকে এই চরিত্রটা করার জন্য কিন্তু মুনমুন কিছুতেই করবে না । অসম্ভব ভয় পাচ্ছে করতে !! আমি ওকে বললাম, তুমি করো, তুমি ভালো করবে…তুমি যে ভাবে কথা বলো, সেটাই “অচলা” র দরকার আর তোমার সৌন্দর্য !! কিন্তু কে শোনে আমার কথা….আমি আর ওর husband continuous nag করে যাওয়াতে , শেষে বললো , ঠিক আছে , আগে আমাকে “গৃহদাহ” দেখাও….. দেখে যদি মনে করি…তাহলে করবো।এবার কোথায় “গৃহদাহ” পাই !! সেই সময়ে সৌভাগ্যক্রমে উত্তম কুমারের কিছু ফিল্ম নিয়ে একটা ফেস্টিভ্যাল হচ্ছিলো “Ice Skating Ring ” এ ৭দিন ধরে …আর সেই লিস্ট এ একদিন “গৃহদাহ” ছিল । আমি মুনমুনকে বললাম …. এবারে সমস্যা হলো, সেই দিনই মুনমুনের একটা ছবি রিলিজ (ছবির নাম “সরগম” , পরিচালক দীনেন গুপ্ত আর সংগীত পরিচালনা পার্থপ্রতিম চৌধুরী ) আর তার প্রিমিয়ার ‘পূর্ণ’ তে !! মুনমুন বললো , নো প্রব্লেম…. প্রিমিয়ারে জাস্ট attend করে , আমি আর তুমি “গৃহদাহ” দেখতে চলে যাবো……যথারীতি আমি আর মুনমুন “পূর্ণ” থেকে চলে গেলাম “Ice Skating Ring ” এ। পুরো ছবিটা দেখলাম ..আমি আগেও দেখেছি অবশ্য। বেরিয়ে সোজা মুনমুনের বাড়ি । তখন হরদম মুনমুনের বাড়ি যেতাম, দারুন আড্ডা আর দারুন খাওয়া দাওয়া ।

উওমদা আর মুনমুনের বাড়িতে গেলে , ডিনার করেই ফিরতে হবে । সুব্রত দা (সুব্রত মুখোপাধ্যায় ), আলপনা , সোমা (সুপ্রিয়ার মেয়ে) , হিন্দুস্থান পিলকিংটন এর পার্থ তালুকদার , ওর wife নীনা তালুকদার, Golf e Asian Games e gold medal winner Lakshman Singh , his wife Chitra, সবাই মিলে একটা দারুন আড্ডা হতো । আর তার মধ্যে আমার একটা কাজ, মুনমুনের কে convince করানো । যাইহোক , ওর বাড়িতে পৌঁছে জিজ্ঞাসা করলাম”এবারে বলো”………
ক্রমশ ………

Leave a Reply

Your e-mail address will not be published. Required fields are marked *